অবিশ্বাস্য, অথচ সত্য: বিজ্ঞানের কয়েকটি অদ্ভুত খবর
বিজ্ঞান কখনো কখনো এমন সব খবর আমাদের সামনে নিয়ে আসে, যা প্রথম শুনলে কল্পকাহিনি বলে মনে হয়। কিন্তু ঘটনাগুলো সত্য—এবং গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা।
গত দুই সপ্তাহেও তেমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। কানাডার জঙ্গলে ক্যাম্পিংয়ের জায়গা খুঁজতে গিয়ে একজন মানুষ আবিষ্কারের সূত্র দিলেন কোটি কোটি বছরের পুরোনো এক মহাজাগতিক সংঘর্ষের। বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেলেন এমন এক ক্ষুদ্র প্রাণ, যা অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রাতেও বেঁচে থাকতে পারে। আবার পৃথিবীতে এতদিন আমাদের চোখের সামনেই ছিল এমন একটি বন্য বিড়াল, যাকে বিজ্ঞান আলাদা প্রজাতি হিসেবেই চিনতে পারেনি।
চলুন দেখি এমন আটটি ঘটনা।
১. ক্যাম্পিংয়ের জায়গা খুঁজতে গিয়ে ৩৯ কোটি বছরের মহাজাগতিক ক্ষত
ঘটনাটি শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে।
কানাডার কুইবেকের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্যাম্পিং করার জায়গা খুঁজছিলেন amateur astronomer Joël Lapointe। স্যাটেলাইট মানচিত্র দেখতে দেখতে Lake Marsal-এর কাছে একটি অস্বাভাবিক গোলাকার ভূ-গঠন তাঁর চোখে পড়ে।
প্রশ্ন জাগল—এটি কি কোনো প্রাচীন উল্কাপিণ্ডের আঘাতের চিহ্ন?
তিনি বিষয়টি বিজ্ঞানীদের জানান। এরপর গবেষণা ও সরেজমিন অভিযানে পাওয়া যায় shatter cone—প্রচণ্ড মহাজাগতিক আঘাতে শিলায় তৈরি হওয়া বিশেষ ধরনের গঠন।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সেখানে প্রায় ২৫ কিলোমিটার বিস্তৃত একটি impact structure রয়েছে এবং সংঘর্ষটি ঘটেছিল আনুমানিক ৩৯ কোটি বছর আগে।
ভাবুন—কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে পড়ে থাকা একটি মহাজাগতিক ক্ষত আমাদের চোখের সামনে ছিল। অথচ সেটি শনাক্ত করার সূত্র এলো একজন মানুষের স্যাটেলাইট ম্যাপে ক্যাম্পিং স্পট খোঁজার সময়।
বিজ্ঞানে কৌতূহলের মূল্য যে কত বড়, ঘটনাটি তার সুন্দর উদাহরণ।
২. ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও বংশবিস্তার করে যে প্রাণ
পৃথিবীতে জীবন কতটা তাপ সহ্য করতে পারে?
ক্যালিফোর্নিয়ার Lassen Volcanic National Park-এর গরম পানির উৎসে বিজ্ঞানীরা নতুন একটি এককোষী প্রাণের সন্ধান পেয়েছেন। নাম দেওয়া হয়েছে Incendiamoeba cascadensis।
অ্যামিবাটি ৬৩°C তাপমাত্রাতেও কোষ বিভাজন করতে পারে, ৬৪°C-তেও সক্রিয় থাকে এবং এমনকি প্রায় ৭০°C তাপমাত্রার সংস্পর্শে আসার পরও পুনরুদ্ধার করতে পারে।
ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কোনো সাধারণ ব্যাকটেরিয়া নয়। এটি আমাদের মতোই nucleus-যুক্ত eukaryotic organism—অর্থাৎ জটিল জীবনের বৃহৎ পরিবারের সদস্য।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—জটিল প্রাণের বেঁচে থাকার সীমা আসলে কোথায়?
আর সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আরও দূরে নিয়ে যায়: পৃথিবীর বাইরে চরম পরিবেশেও কি এমন জীবন থাকতে পারে?
৩. চোখের সামনেই ছিল—তবু এক শতাব্দী ধরে চিনতে পারিনি এই বন্য বিড়ালকে
বলিভিয়ার Yungas অঞ্চলের cloud forest-এ বসবাসকারী ছোট্ট একটি বন্য বিড়ালকে স্থানীয় মানুষ অনেক আগে থেকেই চিনতেন।
তাদের কাছে এর নাম—Tilcayo।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি genetic analysis করে বুঝতে পেরেছেন—এটি পরিচিত tiger cat-এর আরেকটি population নয়; এটি আলাদা একটি species।
এর বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে Leopardus tilcayo।
এটি এতই ছোট যে পূর্ণবয়স্ক প্রাণীটির ওজন প্রায় তিন পাউন্ড এবং আকার অনেক গৃহপালিত বিড়ালের চেয়েও ছোট হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এর lineage অন্য আত্মীয়দের থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে গেছে। এটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর নতুনভাবে নামকরণ করা living wild-cat species বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—প্রাণীটি নতুন সৃষ্টি হয়নি। সে এতদিন সেখানেই ছিল। নতুন হয়েছে শুধু আমাদের জ্ঞান।
৪. এক শতাব্দী পর নতুন পেঙ্গুইন প্রজাতি
বন্য বিড়ালের পর এবার পেঙ্গুইন।
দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের অত্যন্ত প্রত্যন্ত Kerguelen Islands-এ বসবাসকারী gentoo penguin-দের genetic analysis করে গবেষকেরা দেখেছেন, যাদের এতদিন একই species-এর বিভিন্ন population বলে মনে করা হচ্ছিল, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জিনগত পার্থক্য রয়েছে।
এর মধ্যে Kerguelen-এর population-কে নতুন species হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নাম দেওয়া হয়েছে Pygoscelis kerguelensis।
গবেষকদের মতে এটি ১০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে নতুনভাবে স্বীকৃত প্রথম penguin species।
মজার বিষয় হচ্ছে, দেখতে এরা অন্য gentoo penguin-এর সঙ্গে এতটাই মিল যে শুধু চোখে দেখে পার্থক্য ধরা কঠিন। DNA এসে যেন বলল—দেখতে একই হলেই সবাই একই নয়।
৫. কানাডার সমুদ্রে লাল চোখ ও লোমশ পায়ের ‘Sea Spider’
কানাডার পশ্চিম উপকূলের Salish Sea-তেও অপেক্ষা করছিল আরেকটি চমক।
University of British Columbia-র গবেষকেরা সেখানে দুটি নতুন sea spider species শনাক্ত করেছেন। প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে Salish Sea থেকে এ ধরনের নতুন species-এর প্রথম বর্ণনা এটি।
একটির নাম Callipallene pilosuspedes। এর রয়েছে লাল চোখ, লোমশ ধরনের পা এবং বিশেষ comb-like spine-যুক্ত অঙ্গ—যা দিয়ে প্রাণীটি নিজের পা পরিষ্কার করতে পারে।
আরেকটির নাম Tanystylum kiixin।
Sea spider-রা সত্যিকারের spider নয়, তবে তারা arthropod এবং spider, scorpion ও horseshoe crab-এর দূরবর্তী আত্মীয়। এদের বিবর্তনের ইতিহাস প্রায় ৫০ কোটি বছর পেছনে যায়।
আরও অদ্ভুত ব্যাপার—কিছু sea spider নিজের চামড়ার মাধ্যমেই শ্বাস নেয়, আর অনেক প্রজাতিতে পুরুষ প্রাণীই ডিম বহন করে সন্তান লালন করে। প্রকৃতি যে আমাদের পরিচিত নিয়ম মেনেই সবসময় চলে না, এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে!
৬. এক পলকের বহু আগেই নিজের শরীর চার ভাগের এক ভাগ করে ফেলে যে এককোষী প্রাণ
Spirostomum ambiguum নামের একটি এককোষী জলজ প্রাণী আছে।
ক্ষুদ্র প্রাণীটির বিশেষত্ব হলো—বিপদ বুঝলে এটি কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে নিজের শরীর সংকুচিত করে ফেলতে পারে। কতটা? মূল দৈর্ঘ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশে।
পুরো ঘটনাটি ঘটে পাঁচ মিলিসেকেন্ডেরও কম সময়ে—মানুষের চোখের পলকের তুলনায় বহু গুণ দ্রুত।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এর ভেতরের calcium-নিয়ন্ত্রিত বিশেষ protein network-এর কার্যপ্রণালি আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন। সেটি অনেকটা জালের মতো কাজ করে এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো কোষকে সংকুচিত করে দেয়।
এই ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানুষের কাজে লাগতে পারে। গবেষকেরা মনে করছেন, এর নীতি বুঝতে পারলে একদিন অত্যন্ত দ্রুত কাজ করা artificial muscle বা ক্ষুদ্র যান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরিতেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ একটি এককোষী প্রাণীও ভবিষ্যতের robotics-কে শিক্ষা দিতে পারে।
গত সপ্তাহে চোখ এড়িয়ে যাওয়া দুটি বিস্ময়
৭. যে প্রবালপ্রাচীরকে ৬০ বছর ধরে মৃত মনে করা হয়েছিল—সেটি আসলে জীবিত
পশ্চিম আফ্রিকার Benin উপকূলে ১৯৬০-এর দশকের জরিপে একটি গভীর সমুদ্রের coral reef-এর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল।
এরপর দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়েছিল, reef-টি সম্ভবত আর জীবিত নেই।
কিন্তু ছয় দশকেরও বেশি সময় পর underwater camera নামিয়ে গবেষকেরা অবাক হয়ে দেখলেন—প্রবালপ্রাচীরটি এখনও জীবিত।
৫০ মিটারেরও বেশি গভীরে সেখানে সুস্থ-looking coral patches এবং নানা প্রজাতির মাছের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এ আবিষ্কার আরও একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে—পশ্চিম আফ্রিকার সমুদ্রের গভীরে হয়তো এমন আরও বহু reef রয়েছে, যেগুলোর কথা বিজ্ঞান এখনও জানে না। মানুষ কোনো জায়গাকে ‘মৃত’ ঘোষণা করলেই প্রকৃতি যে সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয় না—এই reef যেন তারই প্রমাণ।
৮. ১২ কোটি ৫০ লাখ বছর পর UV আলোয় দেখা গেল কুমিরের ছদ্মবেশ
স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাওয়া Montsecosuchus depereti নামের প্রাচীন crocodile-relative-এর fossil-এর বয়স প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ বছর।
সাধারণ আলোয় fossil-টি দেখলে যা চোখে পড়ে না, ultraviolet বা UV আলো ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা সেখানে আশ্চর্য কিছু দেখতে পান।
প্রাণীটির লেজের অংশে দেখা যায় পর্যায়ক্রমিক হালকা-গাঢ় band-এর মতো pattern।
গবেষকদের ধারণা, এগুলো সম্ভবত প্রাণীটির camouflage coloration-এর চিহ্ন। যদি ব্যাখ্যাটি নিশ্চিত হয়, এটি crocodylomorph-এর প্রাচীনতম সংরক্ষিত colour pattern-গুলোর একটি হতে পারে।
অর্থাৎ কোটি কোটি বছর আগে প্রাণীটি শুধু দেখতে কেমন ছিল তা নয়—তার শরীরে কী ধরনের রঙের নকশা থাকতে পারে, সেটিও আমরা আজ বুঝতে শুরু করছি।
শেষ কথা: পৃথিবী এখনও পুরোপুরি আবিষ্কৃত হয়নি
আমরা প্রায়ই মনে করি পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের জানার মতো মৌলিক বিষয়গুলো হয়তো ইতোমধ্যে জানা হয়ে গেছে। কিন্তু গত দুই সপ্তাহের এই কয়েকটি খবরই সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
একটি নতুন বন্য বিড়াল এতদিন আমাদের চোখের সামনেই ছিল। একটি নতুন penguin species পুরো একটি দ্বীপে বাস করছিল। কানাডার সমুদ্রে অজানা sea spider ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একটি ‘মৃত’ coral reef ছয় দশক পরও জীবিত।
আর কুইবেকের জঙ্গলে ৩৯ কোটি বছরের মহাজাগতিক সংঘর্ষের ক্ষত লুকিয়ে ছিল—যতক্ষণ না একজন মানুষ ক্যাম্পিংয়ের জায়গা খুঁজতে গিয়ে স্যাটেলাইট ম্যাপে একটি গোল দাগ দেখে প্রশ্ন করলেন।
বিজ্ঞানের সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই। উত্তর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়। আর কখনো কখনো একটি বড় আবিষ্কারের শুরু হয় খুব ছোট একটি প্রশ্ন দিয়ে—“ওটা এমন কেন?”
তথ্যসূত্র
• Reuters — Tenacious hot springs amoeba sets heat tolerance record
• ScienceDaily — Ancient impact structure in Quebec
• Associated Press — Newly identified Bolivian wild cat
• ScienceDaily — Newly recognized penguin species
• Phys.org — New Salish Sea spider species
• ScienceDaily — Fast contraction in Spirostomum