জুলাই জাতীয় সনদ: কার লাভ, কার ক্ষতি?
জুলাই গণআন্দোলনের পর একটি কথা মানুষের মনে প্রবলভাবে জেগেছিল—”গড়ব মোরা নতুন বাংলাদেশ।” কিন্তু প্রশ্ন ছিল, সেই নতুন বাংলাদেশ গড়া হবে কীভাবে? সাধারণ মানুষের মনে আবেগ ছিল প্রবল, কিন্তু ছিল না স্পষ্ট পদ্ধতিগত ধারণা। জুলাই সনদেই সেই পদ্ধতিগত সমাধান ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু অনেকেই তা বোঝার চেষ্টা না করে শুধু আবেগ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চান। সমস্যা হচ্ছে, আবেগ স্থায়ী নয়। সময় গড়ালে, পরিস্থিতি বদলালে আবেগ স্তিমিত হয়; আর তার সঙ্গে ফিকে হয়ে যায় মূল প্রশ্নটির গুরুত্বও—কীভাবে সত্যিকার অর্থে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা যাবে?
জুলাই সনদের গণভোটে যারা “হ্যাঁ” বা “না” দিয়েছেন, তাদের অনেকেই এখনো জানেন না—“না” দিয়ে কী হারালেন, “হ্যাঁ” দিয়ে কী পাওয়ার সুযোগ হল? যে সমাজ এই স্পষ্টতা ছাড়াই আবেগনির্ভর চক্রে বন্দী থাকে, সেখানে আধিপত্যবাদ, দুর্নীতি আর ব্যক্তিস্বার্থ মহামারীর মতো ছড়ায়—আর রাষ্ট্র ভেতর থেকে দুর্বল হতে থাকে।
আজ বিএনপি সরকার যে সংকটে ভুগছে, তার সমাধানও এই একই জায়গায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অপসারণ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলিকে সরিয়ে দেওয়া—প্রতিটি বিতর্কের গোড়ায় একটিই কারণ: রাষ্ট্র এখনো পুরনো কাঠামোতেই চলছে, যেখানে একক ইচ্ছাই শেষ কথা। এই কাঠামো থেকে বের না হলে সরকার বদলালেও সংকট বদলাবে না—কেবল সংকটের মুখ বদলাবে। জুলাই সনদ ঠিক এই পুরনো কাঠামো ভাঙার নকশা।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না—ছাত্র, শ্রমিক, নারী, পেশাজীবী সবাই মিলে যা দাঁড় করিয়েছিলেন, তা একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র কাঠামো বদলের দাবি। এই অভ্যুত্থানের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এরপর কী? কেবল সরকার পরিবর্তন কি যথেষ্ট, নাকি রাষ্ট্রের কাঠামোই পরিবর্তন করতে হবে? সেই দাবি থেকেই সংস্কার কমিশন, তারপর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন—এই ছয় খাতে প্রস্তাব তৈরি হয়, ৩০টিরও বেশি দলের সঙ্গে আলোচনার পর তৈরি হয় “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫”। এটি কোনো একক দলের ইশতেহার নয়—একটি জাতীয় চুক্তি। প্রশ্ন একটাই: এই চুক্তি কি বাস্তবায়ন হচ্ছে, নাকি নতুন মোড়কে পুরনো কাঠামোই টিকিয়ে রাখা হচ্ছে?
আসুন দেখি জুলাই সনদ আসলে কী চায়।
কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম মূল কারণ ছিল ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। একজন ব্যক্তি বা একটি দল দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করেছে—ফলে গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো থাকলেও তার ভিত ছিল দুর্বল।
জুলাই সনদ এই সমস্যার একটি সরাসরি সমাধান প্রস্তাব করে। এতে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রধানের পদে থাকতে পারবেন না।
এই দুটি প্রস্তাবের গুরুত্ব গভীর। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র ও দলকে আলাদা করার একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ফলে প্রশাসনে দলীয় প্রভাব কমবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে।
একইভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে—বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং ক্ষমতার একক কেন্দ্র ভেঙে দিয়ে বহুমাত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা। তবে এই কাঠামো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, আর তাই বাস্তবে আমরা প্রায়ই তার বিপরীত চিত্র দেখি—রাষ্ট্র এখনো অনেকাংশে পুরনো অভ্যাসেই চলছে। ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত একক রাজনৈতিক ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে শাসনতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নে দেরী হলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী রূপ নিতে পারে। বিএনপি সরকার সত্যিই এই পুরনো কাঠামো ভেঙে সামনে এগোবে কি না, তা অচিরেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব
জুলাই সনদের প্রস্তাব হচ্ছে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে নির্বাহী প্রভাবমুক্ত রাখতে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) সংশোধন করতে হবে। সংশোধিত বিধানে রাষ্ট্রপতি কোনো পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারবলে নিম্নলিখিত পদসমূহে নিয়োগ দিতে পারবেন—
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ।
নির্বাচন: প্রশ্নবিদ্ধতার অবসান ও বিশ্বাসযোগ্যতার নির্মাণ
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে নির্বাচন ব্যবস্থার উপর। একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচন মানুষের আস্থা ভেঙে দিয়েছে।
জুলাই সনদ এই জায়গাটিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে। এতে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে—যেখানে সরকার ও বিরোধী দল যৌথভাবে নির্বাচনকালীন নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে। নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ হবে রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে।
এছাড়া নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে—৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
এর ফলে নির্বাচন আর কোনো একক দলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না; বরং একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
সংবিধান: জনগণের অনুমতি ছাড়া পরিবর্তন নয়
বাংলাদেশে সংবিধান বারবার রাজনৈতিক স্বার্থে পরিবর্তিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। জুলাই সনদ এই প্রবণতা বন্ধ করতে চায়। এতে প্রস্তাব করা হয়েছে—সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষের সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের পাশাপাশি উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনও বাধ্যতামূলক হবে। ফলে কোনো সরকার একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।
একই সঙ্গে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের সীমিত ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান, যা পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে আলোচনায় আসে, তা পুনর্বহালের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবর্তনের জন্য গণভোট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে জনগণের অনুমতি ছাড়া বড় কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তন আর সম্ভব হবে না।
জরুরি অবস্থা ঘোষণা
জুলাই সনদে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এর অপব্যবহার বন্ধ করা যায়। জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য কেবল প্রধানমন্ত্রীর প্রতি-স্বাক্ষর যথেষ্ট হবে না; বরং মন্ত্রিসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিরোধী দলের নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে নাগরিকের জীবনের অধিকার এবং সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিচার ও দণ্ড সংক্রান্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না। এর ফলে জরুরি অবস্থা আর রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আইনসভা: একক সিদ্ধান্ত থেকে যৌথ পর্যালোচনায়
দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তনের মাধ্যমে আইন প্রণয়নে একটি অতিরিক্ত পর্যালোচনার স্তর যুক্ত করা হয়েছে।
উচ্চকক্ষ আইনগুলো পর্যালোচনা করবে, ফলে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কমবে এবং নীতিগত ভুল কমে আসবে।
উচ্চকক্ষের গঠন: উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত মোট ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ, জনগণ সরাসরি উচ্চকক্ষের জন্য আলাদা ভোট দেবে না; বরং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তারা উচ্চকক্ষে আসন পাবে।
নারীর অংশগ্রহণ: প্রতীকী নয়, বাস্তব
জুলাই সনদ নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যেতে চায়। সংসদে নারীর আসন বৃদ্ধি এবং ধীরে ধীরে ৩৩% নারী প্রার্থী নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—যাতে এটি কেবল প্রতীকী না থেকে বাস্তব প্রতিনিধিত্বে রূপ নেয়।
বিচার বিভাগ: বিচারহীনতার অবসান, ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা
জুলাই সনদে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধির মাধ্যমে নাগরিকের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্তরে সহজে ও দ্রুত বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সাধারণ মানুষকে আর বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে ঘুরতে হবে না এবং ন্যায়বিচার বাস্তব অর্থেই সবার নাগালের মধ্যে চলে আসবে।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন
জুলাই সনদ পুলিশকে ভয়ের প্রতীক থেকে নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করবে। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছে—যেখানে নিয়োগ, পদায়ন ও তদন্ত রাজনৈতিক নির্দেশে নয়, বরং আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। এজন্য একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে, যা পুলিশ ও নাগরিক—উভয় পক্ষের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করবে এবং পুলিশকে বেআইনি প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেবে; কমিশনের ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আইন দ্বারা বাধ্যতামূলক হবে।
জনপ্রশাসন: দলীয়করণ থেকে পেশাদার রাষ্ট্র ব্যবস্থায়
জুলাই সনদ জনপ্রশাসনকে দলীয়করণ থেকে মুক্ত করে একটি পেশাদার ও দক্ষ ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে—যেখানে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, বরং যোগ্যতা ও নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে; এ লক্ষ্যে স্বচ্ছ, বিধিবদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন: লুণ্ঠনের সংস্কৃতি ভেঙে জবাবদিহিতার সূচনা
দুর্নীতি দমন কমিশনকে বর্তমান বিধিবদ্ধ (statutory) প্রতিষ্ঠান থেকে সাংবিধানিক (constitutional) প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে জুলাই সনদে। অর্থাৎ, এর গঠন, ক্ষমতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সরাসরি সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকবে। ফলে কোনো সরকার ইচ্ছামতো এই প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ পাবে না। জুলাই সনদ দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে একটি কার্যকর জবাবদিহিমূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে—যেখানে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুরক্ষা পাবে না; বরং তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন প্রক্রিয়া
জুলাই সনদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও বহু-পক্ষীয় প্রক্রিয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং সংসদের অন্যান্য প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
এই কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সদস্যদের প্রস্তাবিত নাম থেকে আলোচনার মাধ্যমে একজন প্রার্থী নির্ধারণের চেষ্টা করবে। যদি সরাসরি ঐকমত্যে পৌঁছানো না যায়, তাহলে ধাপে ধাপে বাছাই (shortlisting) এবং প্রয়োজন হলে র্যাংকড চয়েস ভোটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি গ্রহণযোগ্য নাম নির্ধারণ করা হবে।
র্যাংকড চয়েস ভোটিং (Ranked Choice Voting) কী? এটি এমন একটি ভোটিং পদ্ধতি যেখানে ভোটাররা একজনকে শুধু ভোট দেয় না, বরং পছন্দের ক্রম (ranking) অনুযায়ী একাধিক প্রার্থীকে সাজায়।
১ম পছন্দ → প্রার্থী A, ২য় পছন্দ → প্রার্থী B, ৩য় পছন্দ → প্রার্থী C। পরবর্তীতে সেই নির্বাচিত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেবেন।
এই প্রক্রিয়ার ফলে কোনো একক ব্যক্তি বা দলের প্রভাব ছাড়াই একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব হবে, যা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
ধাপ ১: বাছাই কমিটি গঠন
৫ সদস্যের কমিটি থাকবে: প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দল থেকে), দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি।
ধাপ ২: নাম প্রস্তাব
রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র এমপিরা প্রার্থী প্রস্তাব করবে। কমিটিও প্রয়োজনে নিজে থেকে নাম যুক্ত করতে পারবে।
ধাপ ৩: নির্বাচন প্রক্রিয়া
আলোচনার মাধ্যমে একজনকে নির্বাচনের চেষ্টা করা হবে। ঐকমত্য না হলে shortlisting, cross-selection ও ranked choice voting প্রয়োগ করা হবে।
ধাপ ৪: রাষ্ট্রপতির ভূমিকা
রাষ্ট্রপতি নিজে প্রার্থী নির্বাচন করবেন না; বরং কমিটি যে প্রার্থী নির্ধারণ করবে, রাষ্ট্রপতি তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেবেন।
কার লাভ, কার ক্ষতি?
এই সনদ বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে সাধারণ মানুষ। তারা পাবে ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং একটি কার্যকর প্রশাসন। তরুণ প্রজন্ম পাবে সমান সুযোগ ও একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ—এভাবেই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই গোষ্ঠী, যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করেছে—দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক-ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং দলীয় সুবিধাভোগী শ্রেণি।
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কী?
পুলিশ হবে বিপদের বন্ধু, আর থানা হবে আস্থার জায়গা—মামলা করা হবে সহজ, ভয় থাকবে না।
আদালতে বিচার হবে সময়মতো—বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না।
চাকরি পেতে ঘুষ দিতে হবে না—যোগ্যতার ভিত্তিতেই সুযোগ মিলবে।
ভোট দিলে সত্যিই ফল বদলাবে—জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে।
তাহলে সমস্যা কোথায়?
জুলাই সনদের বিষয়গুলো স্পষ্ট—এখানে কোনো ধরনের অস্পষ্টতার (ambiguity) সুযোগ নেই। দীর্ঘ আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে এসব বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে উঠেছে, এবং জনগণও এর পক্ষে মত দিয়েছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও একটি মহল এর বিরোধিতা করছে। কেন করছে—তা হয়তো আজ স্পষ্ট নয়, কিন্তু খুব শিগগিরই জনগণ তা বুঝতে পারবে। তখন যারা এই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে, তাদের বিরুদ্ধে তীব্র জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হওয়া অবশ্যম্ভাবী।
একই সঙ্গে আশঙ্কা করা যায়—সরকার হয়তো ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ বিভিন্ন অনুদানভিত্তিক কর্মসূচিকে সামনে রেখে মূল সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নটি আড়াল বা বিলম্বিত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু এসব সাময়িক সুবিধা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে চাপা দেওয়া সম্ভব নয়।
তারপরও যদি এটি বাস্তবায়নের পথে না যায়, তাহলে প্রশ্নটি আর তাত্ত্বিক থাকে না—এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্নে পরিণত হয়।
আজ আমরা দেখছি—একদিকে আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক, অন্যদিকে বিএনপির ভেতরের বিদেশী আধিপত্যবাদী শক্তির প্রভাবে গড়ে ওঠা একটি মহল এই জুলাই সনদের বিরোধিতা করছে।
এর উত্তর খুবই সহজ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যেমন রোগজীবাণু সহজে বিস্তার লাভ করে, তেমনি জবাবদিহিহীন ও দুর্বল রাজনৈতিক পরিবেশে বাইরের শক্তির প্রভাব বিস্তারও সহজ হয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হলে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে এবং ক্ষমতা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হয়ে পড়লে বিদেশি শক্তি নিজেদের স্বার্থ আদায়ের জন্য সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পায়।
অতএব, সঠিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তুলতে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার অপরিহার্য। শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে পেশিশক্তি, ভয়ভীতি, দলীয়করণ ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির ভিত্তি দুর্বল হয় এবং জনগণের কাছেও এ ধরনের রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের অধীনে নেওয়া, বিরোধী মত দমন এবং জবাবদিহিহীন ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাজনীতির যে ধারা তৈরি করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। সেই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটিই বদলাতে হবে। তাই আওয়ামী লীগের আমলে দেখা দেওয়া ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রুখতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং কার্যকর রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
উপসংহার
জুলাই জাতীয় সনদ কোনো কাগজ নয়; এটি একটি সুযোগ—একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার সুযোগ। এই সনদ দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে, আমরা আবার সেই পুরনো অন্যায়, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের রাষ্ট্রেই ফিরে যাবো। তাই এই সনদের প্রতিটি প্রস্তাব আমাদের সবারই বুঝতে হবে। আর সে জন্য আমাদের নতুন করে শপথ নিতে হবে—জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেব না।