|

ঘুষ ও দুর্নীতি রোধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা— অবশ্যই সম্ভব, শীর্ষ নেতৃত্ব চাইলে

বাংলাদেশে ঘুষ ও দুর্নীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রায় সর্বস্তরে তা ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। জমির নামজারি, লাইসেন্স, পাসপোর্ট, কর-শুল্ক, পুলিশি সেবা, সরকারি অনুমোদন, টেন্ডার, চাকরি, বদলি-পদায়ন—সবখানেই এর অভিযোগ। এমনকি নিজের ন্যায্য পাওনা, যেমন পেনশনের টাকা তুলতেও অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে হয়। সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত দালাল, প্রভাবশালী চক্র, “মামার জোর” ও সুপারিশ-বাণিজ্যের মুখোমুখি হতে হয়।

তাহলে প্রশ্ন হলো—এই ব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশের মুক্তির পথ কি আছে?

মুক্তির পথ অবশ্যই আছে। এই প্রবন্ধে আমরা তার একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা তুলে ধরব। এটি কোনো হাওয়ায় ভেসে আসা ধারণা নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছে। শেষে আমরা কয়েকটি বাস্তব উদাহরণও দেব।

আরেকটি কঠিন বাস্তবতা আছে। গত কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রের একটি সুবিধাভোগী অংশ নিজ দেশের জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়নি। তারা দেশকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। পরে সেই অর্থের বড় অংশ ইউরোপ ও আমেরিকায় সরিয়ে নিয়ে পরিবার ও সন্তানসন্ততির ভবিষ্যতের ঠিকানা গড়েছে—এবং এখনও গড়তে চায়। কানাডার বহুল আলোচিত “বেগমপাড়া” তার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল। বিদ্যমান ব্যবস্থা অটুট থাকলে এই অপসংস্কৃতির অবসান কঠিন।

২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” বলেছিলেন। একই সংবাদ সম্মেলনে তাঁর এক সাবেক পিয়নের প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের কথাও উঠে আসে। ঘটনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ঘোষণা যথেষ্ট নয়। দরকার এমন ব্যবস্থা, যেখানে দুর্নীতি করাই কঠিন হবে।

মূল কথাটি সহজ। দুর্নীতিবাজ যদি জানেন তাঁর কাজের ডিজিটাল রেকর্ড থাকবে এবং ধরা পড়লে শাস্তি এড়ানো কঠিন হবে, তাহলে তিনি বহুবার ভাববেন। আমাদের লক্ষ্য সেই ভয় ও ঝুঁকি তৈরি করা।

পানি যেমন ওপর থেকে নিচে নামে, দুর্নীতিও ওপর থেকে নিচে নামে। শীর্ষ পর্যায়ে প্রশ্রয় থাকলে তার প্রভাব নিচেও পড়ে। আবার শীর্ষ নেতৃত্ব সততা ও জবাবদিহির প্রশ্নে দৃঢ় থাকলে সেই বার্তাও পুরো প্রশাসনে যায়।

তাই উদ্যোগ শুরু হতে হবে ওপর থেকে। আমলাতন্ত্রের সুবিধাভোগী অংশ ও দীর্ঘদিনের স্বার্থচক্র বাধা দেবে। সেই বাধা অতিক্রম করার দৃঢ়তা শীর্ষ নেতৃত্বের থাকতে হবে।

আমাদের প্রস্তাব একটি জাতীয় সততা ও দুর্নীতি-ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সরকারি সেবা, সিদ্ধান্ত, নিয়োগ, বদলি-পদায়ন, টেন্ডার ও সম্পদ ঘোষণার গুরুত্বপূর্ণ ধাপে থাকবে ডিজিটাল রেকর্ড, অডিট ট্রেইল ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কেমোথেরাপি—গোপনীয়তা, অস্বচ্ছতা, দালালি, ইচ্ছাকৃত বিলম্ব এবং নথি গায়েব করার সুযোগকে সরাসরি আঘাত করবে।

১. আগে ঝুঁকির মানচিত্র, পরে সম্প্রসারণ

প্রথম দিনেই পুরো প্রশাসন ডিজিটাল করার দরকার নেই। শুরু করতে হবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত দিয়ে।

ভূমি, পাসপোর্ট, কাস্টমস, কর, পুলিশি নাগরিক সেবা, লাইসেন্স, সরকারি ক্রয়, বড় প্রকল্প, সরকারি নিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ বদলি-পদায়ন—এসব আগে আসতে পারে।

দেখতে হবে কোথায় ফাইল বেশি আটকে থাকে। কোথায় দালাল সক্রিয়। কোথায় নগদ লেনদেন হয়। কোথায় ব্যক্তিগত সুপারিশ বেশি কাজ করে।

এই তথ্য থেকেই তৈরি হবে দুর্নীতি-ঝুঁকির মানচিত্র।

২. প্রতিটি আবেদনের ডিজিটাল পরিচয়  ও সময়সীমা

প্রতিটি সরকারি আবেদনের একটি অনন্য ট্র্যাকিং নম্বর থাকবে। কুরিয়ার পার্সেলের মতো নাগরিক দেখতে পারবেন তাঁর ফাইল কোথায় আছে।

আবেদন জমা, কর্মকর্তা নির্ধারণ, যাচাই, ফাইল স্থানান্তর, অতিরিক্ত কাগজ চাওয়া, সিদ্ধান্ত, অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান—সব ধাপ রেকর্ড হবে।

তারিখ থাকবে। সময় থাকবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিচয় থাকবে। সিদ্ধান্তের কারণও থাকবে।

তখন “ফাইল আমার কাছে ছিল না” বা “উপরে পাঠিয়েছি”—এ ধরনের অজুহাতের সুযোগ কমবে।

৩. ফাইল আটকে ঘুষ আদায়ের পথ বন্ধ

ঘুষ আদায়ের পুরোনো কৌশল হলো বৈধ কাজ আটকে রাখা।

তাই প্রতিটি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। সময় পার হলেই সিস্টেম লাল সংকেত দেবে। কর্মকর্তাকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

একই কর্মকর্তার কাছে বারবার অস্বাভাবিক দেরি হলে সেটিও তদন্তযোগ্য সংকেত হবে।

নাগরিক মোবাইলে দেখবেন আবেদনের অবস্থা, সময়সীমা ও সরকারি ফি। স্পষ্ট লেখা থাকবে—“এর বাইরে কোনো টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”

নিচে থাকবে অভিযোগের বোতাম। একটি ক্লিকেই অভিযোগ স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থার কাছে যাবে। সংশ্লিষ্ট ফাইলের ডিজিটাল ইতিহাসও সঙ্গে যাবে।

৪. নগদ লেনদেন ও চেনাজানার সুযোগ কমানো

সরকারি অফিসে হাতে হাতে নগদ লেনদেন যতটা সম্ভব বন্ধ করতে হবে। সব ফি যাবে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কার্ড বা সরকারি ডিজিটাল পেমেন্টে। প্রতিটি লেনদেনের নম্বর থাকবে।

ফাইল বণ্টনও হবে কম্পিউটার-নির্ধারিত পদ্ধতিতে, কাজের ধরন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে—মানুষের পছন্দে নয়।

ফলে “চেনা অফিসার দিয়ে কাজ করানো” বা নির্দিষ্ট কর্মকর্তার কাছে ফাইল পাঠানোর সুযোগ কমবে।

৫. AI হবে সহায়ক টুল

কিছুদিনের মধ্যেই বিপুল তথ্য জমবে। মানুষের পক্ষে প্রতিদিন লাখো লেনদেন দেখা সম্ভব নয়। এখানেই AI ও data analytics কাজে লাগবে।

স্মোক ডিটেক্টর যেমন বলে, “এখানে ধোঁয়া আছে”, AI তেমনি বলবে—“এখানে কিছু অস্বাভাবিক।”

AI কাউকে দুর্নীতিবাজ ঘোষণা করবে না। এটি শুধু তদন্তকারীর দৃষ্টি দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাবে।

ধরা যাক, একই কাজ করা ২০ কর্মকর্তার মধ্যে ১৯ জনের গড় সময় ১২ দিন। একজনের ৩৫ দিন। অথচ তিনিই কিছু নির্দিষ্ট আবেদন এক দিনে অনুমোদন করছেন।

AI এটিকে অস্বাভাবিক প্যাটার্ন হিসেবে চিহ্নিত করবে। এরপর মানুষ তদন্ত করবে।

৬. ব্যক্তি নয়, বড় দুর্নীতির চক্র ধরুন

বড় দুর্নীতি প্রায় কখনোই একা একজন মানুষ করেন না। এর পেছনে থাকে কর্মকর্তা, দালাল, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সহযোগীদের চক্র।

কয়েক বছরের তথ্য মিলিয়ে দেখা যাবে—একই কর্মকর্তা কি বারবার একই ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিচ্ছেন? একই কয়েকজন কি ঘুরেফিরে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন? একই সুপারিশকারী কি নির্দিষ্ট লোকদের পদায়ন করাচ্ছেন?

লক্ষ্য হবে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা।

৭. নিয়োগ, পদায়ন ও টেন্ডারে ডিজিটাল ট্রেইল

গুরুত্বপূর্ণ বদলি-পদায়নের প্রতিটি ধাপ রেকর্ড করতে হবে।

পদের যোগ্যতা কী? কারা বিবেচিত হয়েছেন? কে নাম প্রস্তাব করেছেন? কেন একজনকে বেছে নেওয়া হলো? কে অনুমোদন দিয়েছেন? কোনো নিয়ম শিথিল করা হয়েছে কি না?

সরকারি নিয়োগেও একই নিয়ম। পরীক্ষার নম্বর, ইন্টারভিউ স্কোর, বোর্ড সদস্য ও চূড়ান্ত নির্বাচন—সব রেকর্ড থাকবে।

টেন্ডারেও AI অস্বাভাবিকতা খুঁজবে। একই প্রতিষ্ঠান বারবার জিতছে কি না। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পালা করে কাজ পাচ্ছে কি না। দর অস্বাভাবিকভাবে কাছাকাছি কি না। কাজ পাওয়ার পর ব্যয় বারবার বাড়ছে কি না।

এসব কোনো রায় নয়। এগুলো তদন্তের সংকেত।

৮. আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মিলতে হবে

উচ্চপদস্থ ও উচ্চ-ঝুঁকির পদে থাকা কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী ডিজিটালভাবে জমা দিতে হবে।

আইনসম্মত সীমার মধ্যে আয়কর, জমি, ফ্ল্যাট, কোম্পানির মালিকানা ও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা যাবে।

অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে সিস্টেম সংকেত দেবে। তদন্ত করবে মানুষ। বিচার করবে আদালত।

৯. স্বাধীন দুদকের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র

দেশের বিভিন্ন দপ্তরের দুর্নীতি-ঝুঁকির তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুদকের একটি জাতীয় সততা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে আসবে।

কোথায় সেবা আটকে আছে? কোথায় অভিযোগ বেড়েছে? কোন কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের আচরণ অস্বাভাবিক? কোথায় পদায়নে সন্দেহজনক প্যাটার্ন? সব এক জায়গা থেকে দেখা যাবে।

ফলে দুদক শুধু অভিযোগের অপেক্ষায় থাকবে না। নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা শনাক্ত করতে পারবে।

তবে দুদক সরকারের ইচ্ছাধীন হলে পুরো ব্যবস্থাই ব্যর্থ হবে। তাই জুলাই সনদের সংস্কার-প্রস্তাব অনুযায়ী দুদককে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার ব্যবস্থা জরুরি। নিয়োগ ও কার্যক্রম পর্যালোচনায় স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

১০. ছোট করে শুরু, ফল প্রকাশ করুন

প্রথম ১২ মাসে কয়েকটি খাতে পাইলট প্রকল্প চালানো যেতে পারে। ভূমি, পাসপোর্ট, কাস্টমস, কর, সরকারি ক্রয় ও বদলি-পদায়ন দিয়ে শুরু করা সম্ভব। তারপর মাপতে হবে ফল।

সেবার সময় কত কমল? দালালি কতটা কমল? কত লাল সংকেত তৈরি হলো? কতগুলো তদন্তে গেল? কত অর্থ উদ্ধার হলো?

প্রতি তিন বা ছয় মাসে একটি প্রকাশ্য ড্যাশবোর্ডে ফল প্রকাশ করতে হবে।

জনগণ তখন নিজেরাই বুঝবেন ব্যবস্থা কাজ করছে কি না।

১১. প্রযুক্তি আছে—এখন দরকার সিদ্ধান্ত

এই প্রস্তাব প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়। পৃথিবীর অন্য দেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা চলছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার KONEPS ও BRIAS সন্দেহজনক টেন্ডার-প্যাটার্ন শনাক্ত করে। এস্তোনিয়া data-driven প্রশাসনে অগ্রসর। সিঙ্গাপুরে নাগরিকরা সরাসরি CPIB-তে দুর্নীতির অভিযোগ করতে পারেন।

এই দেশগুলোর সাফল্য শুধু প্রযুক্তির কারণে নয়। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি ও আইনের শাসনও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশও পারবে।

তাই প্রশ্ন এখন আর শুধু প্রযুক্তির নয়। প্রশ্ন—সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না।

শেষ কথা

শুধু সততার উপদেশ দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ হয় না। এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হয় যেখানে অসৎ হওয়া কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি।

আমাদের প্রস্তাবের মূল কথাও সেটিই। 

  • প্রতিটি সিদ্ধান্তের ডিজিটাল পদচিহ্ন থাকবে।
    অস্বাভাবিকতা দ্রুত ধরা পড়বে।
  • দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত করবে।
  • আর কেউ যেন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবে সহজে রক্ষা না পায়।
  • এই ব্যবস্থা গড়ার প্রযুক্তি আজ আছে। উদাহরণও আছে।

এখন প্রয়োজন শীর্ষ নেতৃত্বের সত্যিকারের সদিচ্ছা ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত।

Share:

Similar Posts

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।