জুলাইয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় বিপদ কোথায়
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি ছিল দীর্ঘদিনের দমন, গুম-খুন, দলীয়করণ ও জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে মানুষের বিস্ফোরিত ক্ষোভ। মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা দল রাষ্ট্রের মালিক হয়ে উঠবে না, প্রতিষ্ঠান স্বাধীন থাকবে এবং ক্ষমতাসীনরাও জবাবদিহির বাইরে থাকবে না।
দুই বছর পরও সেই আকাঙ্ক্ষার বড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। কিন্তু জুলাইকে যদি শুধু সরকার পতনের ঘটনা না দেখে রাষ্ট্র পরিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে দেখি, তাহলে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখনো সামনে। জুলাইয়ের সময় তরুণ সমাজ ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী যে আত্মসচেতনতা ও ঐক্যের পরিচয় দিয়েছিল, তা যদি আমাদের সমষ্টিগত স্মৃতি থেকে মুছে যায়, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে আসার সুযোগ পাবে। তাই প্রশ্ন হলো—জুলাই যে পরিবর্তনের দরজা খুলেছিল, আমরা কি সেই দরজা খোলা রাখতে পারব?
রাজনৈতিক শূন্যতা ও জামায়াতের উত্থান
শেখ হাসিনার পতনের পর একটি বড় রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তরুণদের একটি অংশ পুরোনো দুই দলের বাইরে এমন একটি শক্তি খুঁজছিল, যারা রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও জবাবদিহির প্রতিনিধিত্ব করবে। কিন্তু নতুন কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি দ্রুত সেই জায়গা পূরণ করতে পারেনি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘদিনের সংগঠন, কর্মীবাহিনী ও সামাজিক ভিত্তি ছিল। ফলে পরিবর্তন প্রত্যাশী ভোটের একটি অংশ তাদের দিকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি আসন পায় এবং নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট অর্জন করে যা তাদের দলের ইতিহাসে বড় উত্থান।
নির্বাচনের আগেই Reuters এই পরিবর্তনটি লক্ষ্য করেছিল। তাদের প্রতিবেদনে জামায়াতের দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি, কল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং অপেক্ষাকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক উপস্থাপনার মাধ্যমে নতুন সমর্থন আকর্ষণের প্রচেষ্টার কথা বলা হয়। অর্থাৎ জামায়াতের উত্থানকে শুধু ধর্মীয় আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যাবে।
জামায়াতের উত্থান মানেই কি বাংলাদেশ উগ্র ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছে?
এ প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। এর পেছনে আছে জামায়াতের ইসলামপন্থী পরিচয়, ১৯৭১-এর ইতিহাস এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এমন এক রাজনৈতিক বয়ান, যা দলটিকে ক্রমাগত কোণঠাসা ও বিতর্কিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। আবার জামায়াতের নিজস্ব অতিরক্ষণশীল আচরণ, রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং কখনো কখনো অযাচিত বক্তব্যও প্রতিপক্ষের হাতে দলটির বিরুদ্ধেই কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
তবে বর্তমান জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে সরাসরি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল না; বরং রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণের মতো বিষয় সামনে এসেছে। তাই জামায়াত শক্তিশালী হচ্ছে মানেই বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ বা ধর্মতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্ত অতিসরলীকরণ। আজ কেউ জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের প্রতি আকৃষ্ট হলেই তাকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের সমর্থক ধরে নেওয়ারও কারণ নেই।
১৯৭১: অমীমাংসিত বোঝা
১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—এটি ইতিহাস। কিন্তু অর্ধশতাব্দী পর বর্তমান প্রজন্মের নেতা-কর্মী বা শিবিরের তরুণদের ওপর সেই সিদ্ধান্তের ব্যক্তিগত দায় চাপানোও ন্যায়সংগত নয়। এক প্রজন্মের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায় অনন্তকাল আরেক প্রজন্ম বহন করবে—এটি গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে যায় না।
সমস্যা হলো, জামায়াত এখনো তার বর্তমান অবস্থানকে ১৯৭১ সালের তৎকালীন পাকিস্তানপন্থী অবস্থান থেকে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে আলাদা করতে পারেনি। প্রশ্ন উঠলেই দলটি কখনো আত্মপক্ষসমর্থনে যায়, কখনো বিষয়টি পাশ কাটায়। অথচ তারা ধারাবাহিকভাবে বলতে পারে: “১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল তৎকালীন পাকিস্তানভিত্তিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত। স্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম সেই অবস্থান বহন করে না। বাংলাদেশই আমাদের রাষ্ট্র; তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নাতীত।”
সুযোগ পেলেই একই অবস্থান স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হলে বিষয়টি বারবার নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ত না এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আবেগনির্ভর ফায়দা নেওয়ার সুযোগও কমে যেত। এ জন্য জামায়াতকে তার ইসলামি আদর্শ ত্যাগ করতে হবে না, সেক্যুলার দলও হতে হবে না। বরং অতীতের একটি অমীমাংসিত রাজনৈতিক বোঝা থেকে বর্তমান দলকে পরিষ্কারভাবে পৃথক করা সম্ভব হবে।
এই বোঝা কাঁধে নিয়ে রাজনীতি করা অনেকটা ম্যারাথনে এক মণ ওজন কাঁধে নিয়ে দৌড়ানোর মতো—এতে নিজের গতি কমে, প্রতিপক্ষও স্থায়ী সুবিধা পায়।
ফরহাদ মজহারের সতর্কতার অর্থ
চিন্তক ফরহাদ মজহার সম্প্রতি বলেছেন, “যতদিন জামায়াত থাকবে, ততদিন আওয়ামী লীগ থাকবে।” কথাটি আক্ষরিকভাবে নেওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু এর মধ্যে একটি রাজনৈতিক সতর্কতা আছে।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল ১৯৭১—নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের একচ্ছত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করা এবং প্রতিপক্ষকে “স্বাধীনতাবিরোধী” পরিচয়ে আটকে রাখা। জুলাই সেই বয়ানকে বড় আঘাত করেছিল। কারণ জুলাইয়ের রাজপথে ধর্মীয়, ধর্মনিরপেক্ষ, বাম, ডান—সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। প্রশ্ন ছিল না কে কোন মতাদর্শের; প্রশ্ন ছিল—রাষ্ট্র কি জনগণের হবে, নাকি একটি দলের?
কিন্তু জামায়াত যত শক্তিশালী হবে এবং একই সঙ্গে তার ১৯৭১-প্রশ্ন যত অমীমাংসিত থাকবে, ততই আওয়ামী লীগের পক্ষে বলা সহজ হবে—“জুলাইয়ের শেষ ফল হলো, স্বাধীনতাবিরোধীরাই শক্তিশালী হয়েছে।” বক্তব্যটি পুরো বাস্তবতা প্রকাশ করে না, কিন্তু আবেগনির্ভর রাজনীতিতে তা কার্যকর হতে পারে। কারণ ১৯৭১ শুধু ইতিহাস নয়; এটি আত্মত্যাগ ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
জুলাইয়ের জন্য আসল ঝুঁকি
রাজনীতি যদি আবার শুধু “১৯৭১-এর পক্ষ বনাম বিপক্ষ” বিভাজনে ফিরে যায়, তাহলে জুলাইয়ের মূল প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যাবে—কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন করা হবে, কীভাবে গুম-দমন বন্ধ হবে, কীভাবে পুলিশ-প্রশাসন-বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা হবে এবং কীভাবে কোনো দলকে আবার সীমাহীন ক্ষমতার মালিক হতে দেওয়া হবে না।
তখন পুরোনো কর্তৃত্ববাদী শক্তি বলতে পারবে: “আমাদের ভুল থাকতে পারে, কিন্তু আমরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি।” আর সেই আবেগের আড়ালে তাদের দমন-পীড়ন ও জবাবদিহিহীনতার প্রশ্ন হারিয়ে যেতে পারে।
সুতরাং সমস্যা জামায়াত শক্তিশালী হওয়া নয়। সমস্যা হলো, তার অমীমাংসিত ১৯৭১-পরিচয় একদিন আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো কর্তৃত্ববাদী শক্তির হাতে শুধু জামায়াতের বিরুদ্ধে নয়, জুলাইয়ের পুরো পরিবর্তনকামী ধারার বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
করণীয়
জামায়াতকে ১৯৭১-এর প্রশ্নে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান থেকে বেরিয়ে বর্তমান অবস্থান দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট করতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশই তাদের রাষ্ট্র—এটি শুধু বক্তব্যে নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও দৃশ্যমান হতে হবে। একই সঙ্গে সব নাগরিকের সমান অধিকার, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও ভিন্নমতের প্রতি সম্মান তাদের নীতি ও আচরণে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শক্তি যত বাড়বে, সংযমও তত বাড়তে হবে। জুলাই কাউকে রাষ্ট্রের নতুন মালিক বানানোর জন্য হয়নি।
অন্য রাজনৈতিক শক্তিরও দায় আছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ও সংস্কারপন্থী ধারার বিকাশ, যা ধর্মবিরোধীও হবে না, আবার ধর্মকে ক্ষমতার একচ্ছত্র পরিচয়ও বানাবে না। বিএনপি ও অন্য দলগুলো সেই জায়গা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে, সংগঠিত অন্য কোনো শক্তি তা পূরণ করবে—কারণ রাজনৈতিক শূন্যতা কখনো দীর্ঘদিন শূন্য থাকে না।
শেষ কথা
শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের ভবিষ্যৎ কোনো একটি দলের হাতে নিরাপদ নয়। এটি নিরাপদ থাকবে তখনই, যখন জনগণ—বিশেষত তরুণ প্রজন্ম—নিজেদের বিচারবুদ্ধি কোনো ঐতিহাসিক বয়ানের কাছে বন্ধক দেবে না।
১৯৭১ আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে; ২০২৪ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—সেই রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা দলের সম্পত্তি নয়। এই দুই ইতিহাসকে মুখোমুখি দাঁড় করানো বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হবে। যেকোনো রাজনৈতিক শক্তিকে বিচার করতে হবে তার বর্তমান আচরণ দিয়ে—তারা কি ভিন্নমত সহ্য করে, প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন রাখতে চায়, সব নাগরিকের সমান অধিকার মানে এবং জবাবদিহির মধ্যে থাকতে প্রস্তুত?
জুলাই কোনো দলের বিজয় ছিল না। এটি ছিল একটি প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি—বাংলাদেশ আর কারও একার রাষ্ট্র হবে না। তাই আজও প্রশ্নটি একই: রাষ্ট্র কি সবার হবে, নাকি আবার কারও একার হয়ে যাবে?
জুলাই যে দরজা খুলেছিল, সেটি খোলা রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।
সূত্র
• বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS), ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — নির্বাচন কমিশনের দলভিত্তিক ভোটের হার
• The Daily Star, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — জামায়াতের ২০২৬ নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান অগ্রাধিকার
• Independent TV — ফরহাদ মজহারের মন্তব্য: “যতদিন জামায়াত থাকবে, ততদিন আওয়ামী লীগ থাকবে”