কানাডার সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ : বাংলাদেশের জন্য কি শেখার আছে?
আমেরিকা আর কানাডার অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, একটা গাড়ি তৈরি হতেই তার যন্ত্রাংশ কয়েকবার সীমান্ত পার হয়ে যায়। কানাডার তেল, কাঠ, অ্যালুমিনিয়াম আমেরিকার কারখানার খরচ কমায়। আবার কানাডাই আমেরিকার সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটা। এই দুই দেশ এখন সত্যিকারের বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
গত ২২ আগস্ট ট্রাম্প প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে দেন। জবাবে কানাডাও ৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় সমপরিমাণ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বসায়। এতেও থামেনি—সেদিনই ট্রাম্প আরও নতুন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন, যার একটা কার্যকর হবে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে। লড়াই তাই থেমে নেই, বরং বাড়ছে।
ট্রাম্প আসলে কী চান?
ওয়াশিংটনের অভিযোগ তিনটা। এক, কানাডার প্রদেশগুলো মার্কিন মদ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। দুই, কানাডার দুধ ও পনিরের বাজার মার্কিন পণ্যের জন্য কম খোলা। তিন, কানাডার শুল্ক-নীতি মার্কিন গাড়ি বিক্রিতে ক্ষতি করছে।
এই অভিযোগগুলো একেবারে মিথ্যা নয়। কানাডার দুধের বাজার সত্যিই বন্ধ ধরনের। কিন্তু সমস্যা হলো, ট্রাম্প শুধু এসব নির্দিষ্ট বাধা সরাতে চাননি। তিনি আরও চেয়েছেন কানাডা যেন স্বাধীনভাবে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে না পারে, আর কানাডার গাড়িশিল্পের ওপরও প্রভাব খাটাতে চেয়েছেন। এ কারণেই ২১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আলোচনা থামিয়ে নিজের প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে আনেন। পরে তিনি বলেন, আমেরিকা “অনেক বেশি চেয়েছে, বিনিময়ে দিয়েছে অনেক কম।” তাঁর ভাষায়, ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি যেন “পেনসিলে লেখা”—যখন খুশি মুছে ফেলা যায়।
শুল্কের টাকা আসলে কে দেয়?
অনেকে মনে করেন, শুল্ক বসালে কানাডা আমেরিকাকে টাকা দেয়। বাস্তবে তা নয়। শুল্ক দেয় আমেরিকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নিজেই, নিজের সরকারকে। ধরুন, একটা মার্কিন কোম্পানি কানাডা থেকে ১০০ ডলারের পণ্য কিনল। ৫০ শতাংশ শুল্কে তাকে বাড়তি ৫০ ডলার দিতে হবে নিজের সরকারকে। এরপর সে হয় দাম বাড়িয়ে দেবে, নয়তো নিজের লাভ কমাবে, নয়তো কানাডীয় বিক্রেতাকে দাম কমাতে চাপ দেবে। ফেডারেল রিজার্ভের গবেষণা বলছে, এই বাড়তি খরচ ধীরে ধীরে দোকানের দামে চলে আসছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হিসাবে, একটা গড় মার্কিন পরিবারকে বছরে প্রায় ১,১০০ ডলার বেশি গুনতে হতে পারে।
তাহলে আমেরিকার লাভ কোথায়?
শুল্ক থেকে সরকারের আয় বাড়ে, এটা ঠিক। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই টাকা যায় কোথায়? সাধারণ মানুষের চিকিৎসা বা সামাজিক নিরাপত্তায়, নাকি অস্ত্র কেনা আর সামরিক বাজেটে? ২০২৫ সালে শুল্ক থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১৯৫ বিলিয়ন ডলার। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন একই সময় দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন সামরিক বাজেট চাইছে—যা শুল্কের আয়ের প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ এই টাকা সামরিক খরচও পুরোপুরি মেটাতে পারবে না, উল্টো সরকারের ঋণ আরও বাড়বে। কৃষকদের বেলাতেও একই কথা—আইন অনুযায়ী শুল্কের একটা অংশ কৃষকদের সাহায্যে যাওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তার সামান্য অংশই তাদের হাতে পৌঁছায়। তাই এই রাজস্ব বৃদ্ধিকে সহজে ‘লাভ’ বলে দেওয়া যায় না।
কিছু আমেরিকান কারখানা সাময়িক সুবিধা পাবে, কারণ কানাডীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে দেশি পণ্য সস্তা মনে হবে। আর শুল্ককে ভয় দেখিয়ে অন্য দেশ থেকে সুবিধা আদায় করাও যায়। কিন্তু এর উল্টো দিকও আছে। যেসব আমেরিকান কারখানা কানাডার কাঁচামাল ব্যবহার করে, তাদের খরচ বাড়বে। কানাডার পাল্টা শুল্কে মার্কিন কৃষক আর রপ্তানিকারকরাও বাজার হারাবেন। এমনকি ট্রাম্প কানাডার বিমান কোম্পানি বমবার্ডিয়ারের পণ্য বয়কটের ডাকও দিয়েছেন—বোঝাই যায়, লড়াইটা এখন আর শুধু ব্যবসার হিসাব নয়, ব্যক্তিগত জেদেও পরিণত হয়েছে।
কানাডার ক্ষতি কতটা?
কানাডার ক্ষতি অনেক বেশি হবে, কারণ তাদের অর্থনীতি আমেরিকার তুলনায় অনেক ছোট, আর রপ্তানির ৭০ শতাংশই যায় আমেরিকায়। অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, এই শুল্কযুদ্ধ চলতে থাকলে কানাডায় প্রায় ৯০ হাজার মানুষ চাকরি হারাতে পারেন, বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬.৮ শতাংশে। শুধু অন্টারিওতেই এ বছর প্রায় ৬৮ হাজার চাকরি কমতে পারে, যা ২০২৯ সাল নাগাদ বেড়ে দাঁড়াতে পারে সোয়া লাখেরও বেশিতে। আগস্ট মাসেই বাস্তবে ৪২ হাজার চাকরি কমেছে। ওয়াইন, কাঠ, আসবাব, পোশাকের মতো ছোট রপ্তানি ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
নেতাদের কথা
প্রসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার বলেছেন, কানাডা যদি আমেরিকার ৫১তম রাজ্য হয়ে যায়, তাহলে তাকে আর শুল্ক দিতে হবে না। তাঁর ভাষায়, আমেরিকা এত বছর কানাডাকে বিনা কারণে ভর্তুকি দিয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী কার্নি জবাবে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন—আমেরিকা কখনোই কানাডার মালিক হতে পারবে না। তাঁর মতে, ট্রাম্পের এই শুল্ক আসলে একটা ভুল হিসাব, যার মাশুল শেষ পর্যন্ত দুই দেশকেই গুনতে হবে।
আমেরিকান জনগণের প্রতিক্রীয়া কি?
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ২৫ শতাংশ আমেরিকান এই শুল্কের পক্ষে। বিপক্ষে প্রায় ৬০ শতাংশ। তবু ট্রাম্প এগিয়ে যেতে পারছেন। কারণ কংগ্রেস আগেই প্রেসিডেন্টকে ব্যাপক বাণিজ্যিক ক্ষমতা দিয়েছে। সেই ক্ষমতায় তিনি ১৯৩০ সালের একটি পুরোনো আইন ব্যবহার করে প্রচলিত তদন্ত ছাড়াই শুল্ক বসিয়েছেন। আইনটি আগে কখনো এভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।
যারা লাভবান, তারা সংখ্যায় কম হলেও সংগঠিত ও প্রভাবশালী। তাদের মধ্যে রয়েছে বড় পুঁজিপতি, সুরক্ষাপ্রাপ্ত শিল্পগোষ্ঠী ও অলিগার্করা। অন্যদিকে ক্ষতির বোঝা ছড়িয়ে পড়ে কোটি কোটি ভোক্তা, ছোট ব্যবসা ও শ্রমিকের মধ্যে। তাই তাদের ক্ষোভ সহজে শক্তিশালী রাজনৈতিক চাপে পরিণত হয় না।
অনেকে ভাবছেন আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। কিন্তু তাতেই ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি দ্রুত বদলে যাবে না। নতুন কংগ্রেস চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। তবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত না হলে তিনি এই নীতি চালিয়ে যেতে পারবেন। ফলে নির্বাচনের ফল নীতির গতি কমাতে পারে, কিন্তু দিক বদলাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
কানাডার আশার কথাও আছে
কানাডা কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে নেই। যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমাতে সরকার নতুন কৌশল নিয়েছে—লক্ষ্য, ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্য দেশে রপ্তানি দ্বিগুণ করা। ২০২৫ সালে অ-মার্কিন বাজারে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ, চীনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ায় জ্বালানি রপ্তানিও বাড়ছে। প্রদেশগুলোর মধ্যে পুরোনো বাণিজ্য বাধাও কমছে—মদ বিক্রি ও কারিগরি সনদের মতো ক্ষেত্রে নতুন আইন পাস হয়েছে, আর এতে ফেডারেল সরকার সর্বোচ্চ রেটিং পেয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও ব্যবসাকে সরকার এ পর্যন্ত মোট ২৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তাও দিয়েছে। এমনকি কানাডার পাল্টা শুল্কও এলোমেলো নয়—বসানো হয়েছে এমন মার্কিন এলাকায়, যেখানে রাজনৈতিক চাপ কাজে লাগবে।
তবে সত্যিটাও মনে রাখা দরকার— কানাডার রপ্তানির এখনো প্রায় ৭০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তাই এই পদক্ষেপগুলো আশাব্যঞ্জক শুরু, চূড়ান্ত সমাধান এখনও নয়।
শেষ কথা
আমেরিকা বড় অর্থনীতির জোরে কানাডাকে বেশি কষ্ট দিতে পারবে, এটা ঠিক। কিন্তু কাউকে কষ্ট দেওয়া মানেই নিজে লাভবান হওয়া নয়। সীমান্তে শুল্কের চেকে দস্তখত আমেরিকান আমদানিকারকেরাই করেন, কিন্তু তার আসল দাম শেষে গিয়ে পড়ে দোকানের র্যাকে, কারখানার খরচে, আর শ্রমিকের চাকরিতে। কানাডার উচিত আলোচনার পথ খোলা রাখা, কিন্তু নিজের সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে কোনো চুক্তি না করা। সেই সঙ্গে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার খোঁজাও এখন সময়ের দাবি।
কানাডার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা
কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক এক নয়। কানাডা একটি উন্নত অর্থনীতি ও জি–৭ সদস্য। বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। তবু বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে কানাডার অবস্থান থেকে আমাদের শেখার আছে।
ভারত বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে আছে। বাণিজ্য, নদীর পানি, বিদ্যুৎ, সীমান্ত, ট্রানজিট ও নিরাপত্তার কারণে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সম্পর্ক আর নির্ভরশীল সম্পর্ক এক নয়।
হাসিনা আমলে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক সমমর্যাদার দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল না। এটি ক্রমেই একটি বিশেষ সরকার ও দলের রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ ভারতকে কী সুবিধা দিয়েছে এবং বিনিময়ে কী পেয়েছে—তার স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে কখনও আসেনি। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, “ভারতকে যা দিয়েছি, তারা সারা জীবন মনে রাখবে।” এই একটি বাক্যই জনমনে প্রশ্ন আরও গভীর করে দিয়েছিল—সম্পর্কটি কি পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে চলছিল, নাকি একতরফা সুবিধার ভিত্তিতে? ফলে তখনকার ক্ষমতাশীল দল ও তাদের সহযোগীরা ছাড়া দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছেই এটি একপক্ষীয়, নতজানু সম্পর্ক বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
কানাডার প্রথম শিক্ষা হলো, আলোচনা চলবে এবং উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় থাকতে হবে। কিন্তু সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক কোনো দল বা ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। চুক্তি হতে হবে লিখিত, স্বচ্ছ ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। সংসদ ও জনগণের কাছে তার জবাবদিহি থাকতে হবে। কোনো সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের সমর্থন চাইবে না। আবার কোনো বিরোধী দলও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ভারতবিরোধী আবেগ ব্যবহার করবে না।
তৃতীয় শিক্ষা হলো, কূটনৈতিক স্বাধীনতার জন্য অর্থনৈতিক বিকল্প দরকার। জ্বালানি, আমদানি, রপ্তানি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। তবে ভারতের নির্ভরতা কমিয়ে চীনের ওপর নতুন নির্ভরতা তৈরি করাও সমাধান নয়। এক নির্ভরতার জায়গায় আরেক নির্ভরতা বসালে স্বাধীনতা আসে না।
বাংলাদেশেরও দরকষাকষির শক্তি আছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ, আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের বড় বাজার—সবই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হুমকির অস্ত্র নয়। এগুলো ন্যায্য বিনিময় নিশ্চিত করার শক্তি।
বাংলাদেশের নীতি হতে হবে বাংলাদেশপন্থী। যে সহযোগিতায় উভয় দেশের লাভ, তা গ্রহণ করতে হবে। যে চুক্তি অসম, তা পুনরায় আলোচনায় আনতে হবে। আর যে দাবি দেশের সার্বভৌমত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেখানে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে হবে।
বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু বশ্যতা নয়। মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু অকারণ শত্রুতা নয়। সহযোগিতা হবে—তবে ন্যায্যতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।