রয়টার্সের দ্বৈতনীতি: অপরাধী হাসিনার রাজনৈতিক পুনর্বাসন
(এই লেখাটি রয়টার্সের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে রচিত। মূল প্রতিবেদনের লিংক নিবন্ধের একদম শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে।)
১০ জুলাই ২০২৬-এ রয়টার্স একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে জানানো হয়েছে—শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। প্রায় এক ঘণ্টার সাক্ষাৎকারে গড়া এই প্রতিবেদন পড়লে মনে হয়, একজন ভীত, নিঃসঙ্গ, নির্যাতিত নেত্রী দেশে ফিরে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়—আর সাংবাদিকতার দায়িত্বও এত সহজ নয়।
শেখ হাসিনা বলেছেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে সরকারের কিছু “ভুল” হতেই পারে। এই একটি শব্দ দিয়ে তিনি যা মুছে দিতে চাইছেন, তা হলো—জাতিসংঘের অনুসন্ধানে উঠে আসা প্রায় ১৪০০ মানুষের মৃত্যু, হাজারো মানুষের আহত হওয়া, নির্বিচার গ্রেপ্তার আর নির্যাতনের বিভীষিকা। এগুলো প্রশাসনিক ত্রুটি নয়। এগুলো রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার অভিযোগ—যা বিশ্বের যেকোনো আদালতে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভুল আর অপরাধ এক জিনিস নয়। ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া যায়; অপরাধের জন্য বিচার হয়। ক্ষমতাবানরা বহুবার এই কৌশল ব্যবহার করেছেন—জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডকেও একসময় “ভুল” বলে হালকা করার চেষ্টা হয়েছিল, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়নে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, সেই অভিযানের অনুমোদন এসেছিল সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। অপরাধকে নরম শব্দে মুড়িয়ে দেওয়ার এই রাজনৈতিক প্রবণতা নতুন নয়—কিন্তু এবার প্রশ্ন হলো, রয়টার্সের মতো একটি বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম কেন এই ভাষা প্রায় বিনা প্রশ্নে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিল?
গুলিবিদ্ধ হয়ে চোখ হারানো তরুণের কথা ভাবুন। সন্তান হারিয়ে লাশের সামনে বসে থাকা মায়ের কথা ভাবুন। গুম হওয়া মানুষের পরিবার এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে, প্রতীক্ষায়। এই মানুষগুলোর কষ্টকে কি আমরা কোনোদিন “ভুল” বলে ক্ষমা করতে পারব?
শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, বাংলাদেশের বিচার “প্রহসনমূলক।” কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের নিজস্ব আইনের অধীনে গঠিত একটি দেশীয় আদালত—কোনো গোপন বা বিদেশি ট্রাইব্যুনাল নয়। মামলায় তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় দিয়েছে। প্রসিকিউশন হাজির করেছে ৫৪ জন সাক্ষী—ভুক্তভোগী, নিহতদের পরিবার, বিশেষজ্ঞ। শেখ হাসিনা অনুপস্থিত থাকায় আদালত তাঁর জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী দিয়েছে, যিনি সাক্ষীদের জেরা করেছেন। এটি প্রমাণহীন প্রহসন নয়।
হ্যাঁ, মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনুপস্থিতিতে বিচার আর মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে—সেই উদ্বেগ উপেক্ষার নয়। বাংলাদেশের উচিত বিচারপ্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। কিন্তু ত্রুটি থাকা মানেই পুরো বিচার মিথ্যা—এই সিদ্ধান্তে লাফ দেওয়া বিপজ্জনক। আর শেখ হাসিনা যদি সত্যিই ন্যায়বিচারে আস্থা রাখেন, দিল্লি থেকে সাক্ষাৎকার না দিয়ে, নিজেই কেন আদালতে দাঁড়িয়ে সেই প্রমাণ চ্যালেঞ্জ করছেন না?
শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, তাঁর সরকার ভালো না মন্দ, সেটা জনগণ ভোটে ঠিক করবে। এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে গভীর একটি প্রতারণা। কারণ যে মানুষটি এক দশকের বেশি সময় ধরে বিরোধী দল দমন করেছেন, গণমাধ্যম স্তব্ধ করেছেন, একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছেন—তিনি আজ “জনগণের রায়ের” কথা বলছেন। যে ভোটাধিকার তিনি নিজে ধ্বংস করেছেন, সেই ভোটাধিকারকেই আজ ঢাল বানাচ্ছেন। আর ফৌজদারি অপরাধ কখনো নির্বাচনী জনপ্রিয়তা দিয়ে মুছে যায় না। কে হত্যার নির্দেশ দিয়েছে, তা সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত হয়—ব্যালট বাক্সে নয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার ভয়, তাঁর বাবা-মায়ের কবরের কাছে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা, দলীয় নেতাকর্মীদের দুর্দশা—সব বিস্তারিতভাবে এসেছে। অথচ নিহত ছাত্রদের মা-বাবার কণ্ঠ কোথায়? পঙ্গু হওয়া তরুণদের যন্ত্রণা কোথায়? গুম হওয়া মানুষের সন্তানের অপেক্ষা কোথায়? প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন মানবিক, ভীত, করুণ এক চরিত্র—আর তাঁর শাসনামলে নিহত মানুষেরা পরিণত হয়েছেন কেবল একটি সংখ্যায়। এই বৈষম্যই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বিপজ্জনক পক্ষপাত—মিথ্যা বলা নয়, বরং কার কষ্টকে মানুষ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আর কার মৃত্যুকে পরিসংখ্যানে চাপা দেওয়া হচ্ছে।
আরেকটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সম্পূর্ণভাবে। শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত এবং আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ-অনুরোধের আওতাভুক্ত হয়েও ভারতের ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ১২৫টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে দল পুনর্গঠন করছেন—নিজের মুখেই তা স্বীকার করেছেন। ভারত কি সত্যিই এসব সম্পর্কে অবগত নয়? দুই দেশের মধ্যে কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন এত দীর্ঘ নীরবতা? আর প্রতিবেদনে যখন বলা হয়, তাঁর প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নত হতে পারে—তখন প্রশ্ন জাগে, দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক কি সত্যিই একজন দণ্ডিত ব্যক্তির রাজনৈতিক ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত?
ন্যায়বিচার প্রতিশোধ নয়। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর নিরাপত্তা, আইনজীবীর অধিকার, আপিলের সুযোগ—সবকিছু নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সাধারণ আওয়ামী লীগ কর্মীকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপরাধী বানানো যাবে না। কিন্তু ন্যায্য বিচার আর রাজনৈতিক পুনর্বাসন এক জিনিস নয়। একজন দণ্ডিত ব্যক্তির আইনি অধিকার আছে, কিন্তু বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে নিজেকে নির্যাতিত গণতান্ত্রিক নেত্রী হিসেবে সাজিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার কোনো স্বতঃসিদ্ধ অধিকার নেই।
মানবতা শুধু একজন প্রাক্তন শাসকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার নাম নয়। মানবতা সমান তীব্রতায় দাঁড়ায় সেই মায়ের পাশে, যিনি সন্তানের কবরের সামনে এখনো কাঁদেন। সেই তরুণের পাশে, যে চোখ হারিয়ে অন্ধকারে বেঁচে আছে। সেই পরিবারের পাশে, যারা এখনো জানে না তাদের প্রিয়জন কোথায়।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে ফিরবেন। কিন্তু তিনি কোনো শহীদ কিংবা ভারতের পছন্দের রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে ফিরবেন না। তিনি ফিরবেন একজন সাবেক সরকারপ্রধান হিসেবে, যাঁকে নথিবদ্ধ, প্রমাণিত অপরাধের জবাব দিতে হবে আইনের সামনে।
ভুল সংশোধন করা যায়। অপরাধের বিচার হয়। আর হাজারো মানুষের রক্তের ইতিহাসকে কোনো নরম শব্দ দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
বাংলাদেশ কারও রাজনৈতিক পশ্চাৎভূমি নয়। এ দেশের ইতিহাস দিল্লি থেকে দেওয়া একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকার দিয়ে নতুন করে লেখা হবে না।
মূল প্রতিবেদন:
https://www.reuters.com/world/asia-pacific/bangladeshs-hasina-plans-december-return-with-party-colleagues-surrender-2026-07-10/