চাঁদে বসতির প্রস্তুতি থেকে মানবদেহের হাড় পুনর্গঠন
চাঁদে বসতির প্রস্তুতি থেকে মানবদেহের হাড় পুনর্গঠন—বিজ্ঞানের দুই নতুন অর্জন
বিজ্ঞানের দুটি সাম্প্রতিক খবর ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্পর্কে নতুন করে ভাবাচ্ছে। একটি মানুষের চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের প্রস্তুতি নিয়ে, অন্যটি মানুষের নিজের কোষ ব্যবহার করে দুর্বল হাড় পুনর্গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে।
দুটি ক্ষেত্র সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু দুটির মধ্যেই রয়েছে একই ধরনের চেষ্টা—প্রকৃতিতে আগে থেকেই থাকা তথ্য ও সম্পদকে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।
চাঁদে মানুষের ভবিষ্যৎ বসতির প্রস্তুতিতে AI
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ NASA ও IBM একটি নতুন Lunar Foundation Model উন্মুক্ত করেছে। এটি এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা, যা চাঁদ সম্পর্কে কয়েক দশক ধরে সংগৃহীত বিপুল তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে।
মূল লক্ষ্য হলো চাঁদের পৃষ্ঠের গর্ত বা crater, পুরোনো আগ্নেয় বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষ করে মেরু অঞ্চলে কোথায় বরফ থাকার সম্ভাবনা বেশি—তা দ্রুত শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করা। (NASA Science)
মডেলটি তৈরিতে NASA-র Lunar Reconnaissance Orbiter-এর প্রায় ১৭ বছরের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় ২০ লাখ image tile দিয়ে এটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে NASA-র GRAIL ও Lunar Prospector এবং জাপানের JAXA-র SELENE/Kaguya অভিযানের তথ্যও যুক্ত হয়েছে। (NASA Science)
কিন্তু চাঁদে বরফ খোঁজা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ভবিষ্যতে মানুষ যদি চাঁদে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে চায়, তাহলে পৃথিবী থেকে প্রতিটি জিনিস বহন করে নেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। চাঁদের বরফ থেকে পানি পাওয়া গেলে তা পান করার পাশাপাশি অক্সিজেন তৈরিতে কাজে লাগতে পারে। এমনকি পানি থেকে hydrogen ও oxygen আলাদা করে ভবিষ্যতে rocket fuel তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ কারণেই চাঁদের মেরু অঞ্চলের অন্ধকার crater-গুলো বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহের জায়গা। এসব স্থানে দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো না পৌঁছানোর কারণে বরফ সংরক্ষিত থাকতে পারে। (IBM Newsroom)
পরীক্ষায় নতুন AI মডেলটি বরফ থাকার সম্ভাবনাময় এলাকা শনাক্ত করার একটি কাজে প্রচলিত শক্তিশালী মডেলের তুলনায় error প্রায় ২২ শতাংশ কমিয়েছে। সামগ্রিকভাবে কিছু নির্দিষ্ট lunar feature শনাক্ত করার ক্ষেত্রে উন্নতি ২৩ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে বলে IBM জানিয়েছে। (IBM Research)
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে AI ইতোমধ্যে চাঁদে মানুষের বসতি স্থাপনের জায়গা ঠিক করে দিয়েছে। বরং ভবিষ্যৎ lunar mission-এর জন্য বিজ্ঞানীদের হাতে আরও উন্নত একটি মানচিত্র ও বিশ্লেষণ-সহায়ক ব্যবস্থা এসেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, NASA ও IBM প্রযুক্তিটি open source করেছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকেরাও এটি ব্যবহার ও আরও উন্নত করতে পারবেন। (NASA Science)
দ্বিতীয় খবরটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের।
Osteoporosis বা হাড় ক্ষয় হলে মানুষের হাড় ধীরে ধীরে পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে সামান্য পড়ে যাওয়া থেকেও মেরুদণ্ড, কোমর, হাত বা পায়ের হাড় ভেঙে যেতে পারে।
নিজের কোষ দিয়েই কি দুর্বল হাড় শক্ত করা সম্ভব?
১১ সেপ্টেম্বর Nature এমন একটি ছোট clinical trial-এর ফল জানিয়েছে, যেখানে গুরুতর osteoporosis-এ আক্রান্ত ১০ জন নারীকে তাঁদের নিজের bone marrow থেকে নেওয়া কোষ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়েছে। তাঁদের বয়স ছিল ৫১ থেকে ৭২ বছরের মধ্যে। (Nature)
গবেষকেরা bone marrow থেকে mesenchymal stromal cells (MSC) সংগ্রহ করেন। কিন্তু সাধারণভাবে এসব কোষ রক্তে প্রবেশ করালে পর্যাপ্ত সংখ্যায় হাড়ের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
তাই গবেষকেরা কোষগুলোর বাইরের অংশে fucose নামের এক ধরনের sugar molecule যুক্ত করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কোষগুলোকে এমন ক্ষমতা দেওয়া, যাতে তারা রক্তপ্রবাহ থেকে আরও সহজে bone marrow ও হাড়ের টিস্যুর দিকে পৌঁছাতে পারে।
পরিবর্তিত কোষগুলো রোগীদের শরীরে একবার intravenous infusion-এর মাধ্যমে দেওয়া হয়। (Nature)
চিকিৎসার আগে এই দশজন নারী বহুবার হাড় ভাঙার শিকার হয়েছিলেন। Nature-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসার পর তাঁদের fracture-এর ঘটনা নাটকীয়ভাবে কমে আসে। গবেষণাটি Cell সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। (Nature)
এই ফল আশাব্যঞ্জক, কারণ ভবিষ্যতে হয়তো রোগীর নিজের কোষকেই ব্যবহার করে দুর্বল হাড়কে পুনর্গঠনের কাজে লাগানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এখানেই সতর্ক থাকা জরুরি।
গবেষণাটি মাত্র ১০ জন রোগীর ওপর, এবং এটি ছিল single-group trial—অর্থাৎ তুলনা করার জন্য আলাদা control group ছিল না। তাই এখনই বলা যাবে না যে osteoporosis-এর নতুন নিশ্চিত চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়েছে। আরও বড় সংখ্যক রোগী নিয়ে controlled clinical trial এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। (ClinicalTrials.gov)
দুই ভিন্ন গবেষণা, একই বার্তা
একদিকে মানুষ চাঁদের মাটিতে বরফ খুঁজছে—ভবিষ্যতে সেখানে টিকে থাকার জন্য। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা মানুষের নিজের শরীরের কোষকে পরিবর্তন করে ক্ষয়প্রাপ্ত হাড় মেরামতের সম্ভাবনা খুঁজছেন।
একটি গবেষণা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরের চাঁদে। অন্যটি নিয়ে যাচ্ছে মানুষের শরীরের অতি ক্ষুদ্র কোষের ভেতরে।
দুটিই এখনো যাত্রার শুরু। চাঁদে স্থায়ী মানববসতি এখনো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, আর osteoporosis-এর cell therapy-ও এখনো পরীক্ষামূলক।
তারপরও এ ধরনের গবেষণাই দেখায় বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা কোন দিকে যাচ্ছে—একদিকে পৃথিবীর বাইরে মানুষের উপস্থিতি বিস্তারের প্রস্তুতি, অন্যদিকে মানুষের নিজের শরীরের ভেতরেই চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনা খোঁজা।
তথ্যসূত্র: NASA, IBM Research, Nature, Cell ও ClinicalTrials.gov।