|

মহাবিশ্বের শৈশবের রহস্য

নক্ষত্র নয়, চেনা ব্ল্যাক হোলও নয়

মহাবিশ্বের আদিকালে খুঁজে পাওয়া রহস্যময় ‘Black Hole Star’

James Webb Space Telescope-এর নতুন আবিষ্কার — সহজ ভাষায়

🔭 এক নজরে

বস্তুর নামMoM-BH*-1, ডাকনাম ‘Black Hole Star’
আলো রওনা দিয়েছিলমহাবিশ্বের জন্মের মাত্র ~৬৬০ মিলিয়ন বছর পর
অর্থাৎ বয়স১৩ বিলিয়ন বছরেরও বেশি আগের ছবি
কেন্দ্রের ব্ল্যাক হোলের ভরসূর্যের প্রায় ১ লক্ষ গুণ
আবিষ্কারক টেলিস্কোপJames Webb Space Telescope (JWST)
যন্ত্রNIRSpec (আলো বিশ্লেষণের যন্ত্র)
প্রকাশনাNature সাময়িকী, পিয়ার-রিভিউড গবেষণা (২০২৬)

মহাবিশ্বের দিকে আমরা যত দূরে তাকাই, আসলে ততই অতীতের দিকে তাকাই। কারণ দূরের কোনো বস্তু থেকে আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে কোটি কোটি বছর সময় নেয়। সেই অতীতের দিকে তাকাতে গিয়ে James Webb Space Telescope (JWST) এবার এমন একটি রহস্যময় বস্তু দেখতে পেয়েছে, যাকে প্রচলিত নক্ষত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যাচ্ছে না, আবার সাধারণভাবে আমরা যে ধরনের ব্ল্যাক হোলের কথা জানি, তার সঙ্গেও এর চেহারা ঠিক মিলছে না।

গবেষকেরা বস্তুটির নাম দিয়েছেন MoM-BH*-1। সহজে বোঝানোর জন্য একে বলা হচ্ছে ‘Black Hole Star’। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো এর বয়স। আমরা বস্তুটিকে এখন যেমন দেখছি, সেই আলো বের হয়েছিল মহাবিশ্বের জন্মের মাত্র প্রায় ৬৬০ মিলিয়ন বছর পর। অর্থাৎ আজ থেকে ১৩ বিলিয়ন বছরেরও বেশি আগের মহাবিশ্বের একটি ছবি আমরা এখন দেখছি।

এতদিন আমরা যে ব্ল্যাক হোল চিনতাম

ব্ল্যাক হোল নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। আমাদের নিজেদের ছায়াপথ Milky Way-তেই অসংখ্য ব্ল্যাক হোল রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। কোনো বড় নক্ষত্র তার জীবনের শেষে নিজের মাধ্যাকর্ষণে ধসে পড়লে তুলনামূলক ছোট stellar black hole তৈরি হতে পারে।

আবার প্রায় প্রতিটি বড় galaxy-র কেন্দ্রেই রয়েছে বিশাল supermassive black hole। আমাদের Milky Way-এর কেন্দ্রেও আছে Sagittarius A* নামের একটি ব্ল্যাক হোল, যার ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লাখ গুণ। পৃথিবী থেকে এটি প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। আরও দূরের galaxy-গুলোর কেন্দ্রেও এমন ব্ল্যাক হোল দেখা গেছে। অর্থাৎ ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব নতুন নয়।

তাহলে নতুন আবিষ্কারটি কোথায়?

MoM-BH*-1 শুধু মহাকাশে অনেক দূরে নয় — এটি আমাদের মহাবিশ্বের ইতিহাসেরও অনেক পেছনে। এর আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে ১৩ বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় লেগেছে। ফলে আমরা বস্তুটিকে আজকের অবস্থায় দেখছি না; দেখছি মহাবিশ্বের জন্মের মাত্র প্রায় ৬৬০ মিলিয়ন বছর পর এটি কেমন ছিল।

সহজভাবে বললে, Milky Way-এর Sagittarius A* আমাদের মহাজাগতিক প্রতিবেশের একটি পরিচিত supermassive black hole। আর MoM-BH*-1 হলো মহাবিশ্বের একেবারে শৈশবের একটি বস্তু — JWST যেন ১৩ বিলিয়ন বছরেরও বেশি পুরোনো একটি ছবি তুলে এনেছে।

কিন্তু শুধু দূরত্বই নতুনত্ব নয়

প্রচলিত সক্রিয় black hole-এর চারপাশে গ্যাস ও ধুলা ঘুরতে পারে এবং ভেতরে পড়ার সময় তা প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে আলো ছড়াতে পারে। কিন্তু MoM-BH*-1-এর সম্ভাব্য গঠন কিছুটা আলাদা। গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর মাঝখানে একটি black hole রয়েছে, কিন্তু সেটি অত্যন্ত ঘন ও বিশাল গ্যাসের আবরণের ভেতরে ঢাকা। এই আবরণ পুরো ব্যবস্থাটিকে অনেকটা একটি অতিকায় নক্ষত্রের মতো আচরণ করাতে পারে। তাই ব্যাখ্যার সুবিধার্থে একে বলা হচ্ছে ‘Black Hole Star’।

এটি এমন নয় যে একটি সাধারণ নক্ষত্রের ভেতরে হঠাৎ black hole বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। বরং কেন্দ্রে black hole, তাকে ঘিরে অস্বাভাবিক ঘন ও বিশাল গ্যাসের আবরণ — দুটো মিলে একটি অদ্ভুত মহাজাগতিক বস্তু।

চেনা সক্রিয় ব্ল্যাক হোলBlack Hole Star (MoM-BH*-1)
গ্যাস-ধুলা ঘুরতে ঘুরতে ভেতরে পড়ে, উত্তপ্ত হয়ে আলো ছড়ায়কেন্দ্রে ব্ল্যাক হোল, কিন্তু তা অত্যন্ত ঘন ও বিশাল গ্যাসের আবরণে ঢাকা
ব্ল্যাক হোলটি সরাসরি “দেখা” যায় তার চারপাশের আলোকরশ্মি দিয়েপুরো ব্যবস্থাটি আচরণ করে অনেকটা একটি অতিকায় নক্ষত্রের মতো
আজকের মহাবিশ্বে সাধারণভাবে দেখা যায়মহাবিশ্বের একেবারে শৈশবে, জন্মের মাত্র ৬৬০ মিলিয়ন বছর পর দেখা গেছে
💡 একটি সহজ তুলনা আমাদের পরিচিত সক্রিয় black hole-কে ভাবতে পারেন একটি গভীর নালার চারদিকে পানি ঘুরতে ঘুরতে ভেতরে পড়ছে — পানি নালার অংশ নয়, কিন্তু তার চারপাশে ঘুরছে। আর Black Hole Star-এর প্রস্তাবিত চিত্রটি অনেকটা এমন — সেই নালাটিই একটি বিশাল ঘন পানির গোলকের গভীরে ঢাকা পড়ে আছে। উদাহরণটি পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক মডেল নয়, কিন্তু পার্থক্যটি কল্পনা করতে সাহায্য করে।

কত বড় এই বস্তু?

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এর কেন্দ্রের ব্ল্যাক হোলটির ভর সূর্যের প্রায় এক লাখ গুণ হতে পারে। ব্ল্যাক হোলটিকে ঘিরে থাকা গ্যাসের আবরণও বিপুল। মাঝখানে বিশাল black hole, আর তার চারদিকে ঘন গ্যাস — black hole-এর আকর্ষণে সেই গ্যাস ভেতরের দিকে ছুটছে, উত্তপ্ত হচ্ছে এবং প্রচণ্ড শক্তি ছড়াচ্ছে।

James Webb কী দেখেছে?

JWST শুধু বস্তুটির একটি ছবি তুলেই থেমে যায়নি। এর NIRSpec যন্ত্র দিয়ে সেখান থেকে আসা আলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দূরের কোনো বস্তুর প্রকৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারেন। অনেকটা মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে শরীরের ভেতরের অবস্থা বোঝার মতো — আলোর মধ্যেও মহাজাগতিক বস্তুর নানা তথ্য লুকিয়ে থাকে।

MoM-BH*-1-এর আলোর বৈশিষ্ট্য দেখে গবেষকেরা দেখেছেন, সাধারণ নক্ষত্র দিয়ে এর বিপুল শক্তি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সহজে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। ঘন গ্যাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দ্রুত বেড়ে ওঠা একটি বিশাল ব্ল্যাক হোলের ধারণার সঙ্গে পর্যবেক্ষণগুলো বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিজ্ঞানীরা এত উত্তেজিত কেন?

কারণ আমরা এটিকে এমন এক সময়ের অবস্থায় দেখছি যখন মহাবিশ্বের বয়স মাত্র প্রায় ৬৬০ মিলিয়ন বছর। এত অল্প সময়ে এত বড় black hole তৈরি হলো কীভাবে — এটাই আসল রহস্য।

আজকের মহাবিশ্বে বিশাল black hole পাওয়া বিস্ময়কর নয়; তাদের বড় হওয়ার জন্য কোটি কোটি বছর সময় ছিল। কিন্তু মহাবিশ্বের একেবারে শৈশবেই বড় black hole পাওয়া অনেকটা কয়েক মাস বয়সী শিশুকে পূর্ণবয়স্ক মানুষের আকারে দেখতে পাওয়ার মতো। তখন প্রশ্ন আসে — এত দ্রুত সে বড় হলো কীভাবে?

এত তাড়াতাড়ি এত বড় ব্ল্যাক হোল তৈরি হলো কীভাবে?

মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। একটি ছোট ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে আশপাশের পদার্থ গ্রহণ করে বড় হতে পারে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। অথচ JWST প্রাচীন মহাবিশ্বেই এমন কিছু বিশাল ব্ল্যাক হোলের সন্ধান দিচ্ছে, যেগুলো বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক আগেই বড় হয়ে গেছে।

একটি ধারণা হলো, মহাবিশ্বের প্রথম যুগে কোনো কোনো ব্ল্যাক হোল হয়তো ছোট নক্ষত্রের মৃত্যু থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়নি। অত্যন্ত ঘন ও বিপুল গ্যাসের পরিবেশে শুরু থেকেই তুলনামূলক বড় আকারে জন্ম নিয়ে খুব দ্রুত আরও বড় হয়েছে। Black Hole Star সেই মধ্যবর্তী পর্যায়ের একটি নমুনা হতে পারে। তবে এটি এখনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও সম্ভাবনা — প্রমাণিত চূড়ান্ত সত্য নয়।

রহস্যময় ‘Little Red Dots’-এর সঙ্গেও কি সম্পর্ক আছে?

JWST মহাবিশ্বের প্রাচীন অংশ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে অসংখ্য ছোট লাল আলোর বিন্দু দেখতে পাচ্ছে, যেগুলোকে বিজ্ঞানীরা Little Red Dots বলেন। এগুলো কী — ঘন প্রাচীন galaxy, ধুলায় ঢাকা নক্ষত্রসমষ্টি, নাকি দ্রুত বেড়ে ওঠা black hole — তা নিয়ে গবেষণা চলছে।

MoM-BH*-1-এর মতো বস্তু যদি সত্যিই ঘন গ্যাসে ঢাকা বিশাল ব্ল্যাক হোল হয়ে থাকে, তাহলে অন্তত কিছু Little Red Dot-এর রহস্য ব্যাখ্যা করার একটি পথ পাওয়া যেতে পারে।

আবিষ্কারটি নিয়ে কোথায় সতর্ক থাকা দরকার

বিজ্ঞানীরা এমন কোনো সম্পূর্ণ নতুন ধরনের নক্ষত্র আবিষ্কার করেছেন, যার আনুষ্ঠানিক নাম এখন থেকে ‘Black Hole Star’ — বিষয়টি এমন নয়। MoM-BH*-1 এবং তার অস্বাভাবিক আলোর বৈশিষ্ট্য JWST দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং গবেষণাটি peer-reviewed সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এর প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গবেষকেরা যে মডেল প্রস্তাব করছেন — একটি বিশাল ব্ল্যাক হোলকে ঘিরে অত্যন্ত ঘন গ্যাসের আবরণ — সেটি আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

আমরা হয়তো black hole-এর জীবনের এমন একটি প্রাচীন ও অস্বাভাবিক পর্যায়ের দিকে তাকিয়ে আছি, যা বুঝতে সাহায্য করতে পারে আজকের galaxy-গুলোর কেন্দ্রে থাকা বিশাল black hole-গুলোর যাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল। ১৩ বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় ধরে ছুটে আসা সামান্য কিছু আলো তাই পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে তুলেছে — মহাবিশ্বের শৈশবে এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন দানবীয় ব্ল্যাক হোল তৈরি হলো কীভাবে?

📖 শব্দকোষ: কঠিন শব্দগুলো সহজ ভাষায়

JWSTJames Webb Space Telescope — মহাকাশে থাকা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ, যা অতি প্রাচীন মহাবিশ্বের ক্ষীণ আলো ধরতে পারে।
NIRSpecJWST-এর একটি যন্ত্র, যা দূরের বস্তু থেকে আসা আলোকে ভেঙে বিশ্লেষণ করে সেই বস্তুর গঠন ও প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য বের করে।
Supermassive black holeসূর্যের চেয়ে লক্ষ-কোটি গুণ ভারী ব্ল্যাক হোল, যা প্রায় প্রতিটি বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকে।
Little Red DotsJWST-এর চোখে ধরা পড়া প্রাচীন মহাবিশ্বের অসংখ্য ছোট লাল বিন্দু, যাদের আসল পরিচয় নিয়ে গবেষণা চলছে।
Peer-reviewedপ্রকাশের আগে অন্য বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের দ্বারা যাচাই করা গবেষণা — বিজ্ঞানে নির্ভরযোগ্যতার একটি স্বীকৃত মানদণ্ড।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

1. Nature — “A black hole star at cosmic dawn” (2026)  https://www.nature.com/articles/s41586-026-10846-4

2. MIT News — “Astronomers discover a brand-new type of astrophysical object: the ‘black hole star'” (12 August 2026)  https://news.mit.edu/2026/astronomers-discover-brand-new-type-astrophysical-object-black-hole-star-0812

3. European Research Council (ERC) — “Earliest known ‘black hole star’ found at cosmic dawn” (2026)  https://erc.europa.eu/news-events/news/earliest-known-black-hole-star-found-cosmic-dawn

Share:

Similar Posts

  • | |

    মিনি-মস্তিষ্ক, ক্যানসারের টিকা আর মহাকাশের বর্ম

    বিজ্ঞান প্রতি সপ্তাহে অসংখ্য খবর দেয়। কিন্তু কিছু খবর সত্যিই থামিয়ে দেয়—ভাবতে বাধ্য করে। ১৫ থেকে ২১ আগস্ট ২০২৬—এই এক সপ্তাহে এমন তিনটি খবর এসেছে, যেগুলো মানুষের ভবিষ্যতের তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দেয়: রোগের বিরুদ্ধে লড়াই, মস্তিষ্কের রহস্য বোঝার চেষ্টা এবং পৃথিবীর বাইরে মানুষের যাত্রাকে নিরাপদ করা।

  • |

    মাড়ির গভীরে ‘কাঁটাযুক্ত’ ক্ষুদ্র রোবট: Periodontitis চিকিৎসায় নতুন পরীক্ষামূলক পথ

    দাঁতের মাড়ির রোগকে আমরা অনেক সময় সামান্য bleeding বা bad breath-এর সমস্যা বলে দেখি। কিন্তু periodontitis দীর্ঘস্থায়ী হলে দাঁতের চারপাশের supporting tissue ও bone ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দাঁত হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এই রোগের একটি বড় সমস্যা হলো periodontal pocket-এর গভীরে তৈরি bacterial biofilm—যেখানে ওষুধ পৌঁছানো এবং জমাট biofilm পুরোপুরি সরানো কঠিন হতে পারে। ৫ আগস্ট ২০২৬-এ Science Advances-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা এই সমস্যার জন্য বেশ অস্বাভাবিক সমাধান পরীক্ষা করেছে: nanothorn-যুক্ত ionogel microrobot।

  • | |

    গণিতের কঠিন সমস্যায় নতুন সাফল্য: কম্পিউটার প্রোগ্রাম ‘Astra’ কী করে দেখাল

    ## রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জুলাই সনদের প্রস্তাবিত গোপন ভোটের দাবি কোথায়?

    একটি ছোট্ট কিন্তু ধারালো প্রশ্ন—নতুন রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হচ্ছেন? শেখ হাসিনার আমলের পদ্ধতিতে, নাকি জুলাই সনদের আলোকে?

    এই প্রশ্নটিকেই যেন সুকৌশলে চাপা দিয়ে রেখেছে সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষ। কথা ছিল, নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি আর শেখ হাসিনার আমলের মতো একটি দলের ইশারায় নির্বাচিত হবেন না; সংসদের দুই কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে, জনগণের প্রতিনিধিদের রায়ে নির্বাচিত হবেন।

    উচ্চকক্ষ এখনো গঠিত হয়নি—মানলাম। কিন্তু নিম্নকক্ষ তো আছে। অন্তত নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দাবি জোরালোভাবে তোলা যেত। কে বাধা দিয়েছিল?

    বিরোধী দল চাইলে এ দাবিতে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারত। জনগণকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পারত—জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি সরকারের মুখের কথা ও কাজের মধ্যে মিল নেই। অথচ তারা সেই সুযোগটি কাজে লাগায়নি।

    সরকারের আগ্রহ নেই—এতে হয়তো বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু বিরোধী দলের ভূমিকা কী? তারা ইতিমধ্যে নিজেদের ১১-দলীয় জোটের একটি শরিক দলের একজনকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে বলেও মনে হয় না। জোটের কোনো দলীয় ব্যক্তিকে মনোনয়ন না দিয়ে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা একজন সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করা যেত।

    কিন্তু মূল প্রশ্ন শুধু প্রার্থী কে হবেন, সেটি নয়; রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি কী হবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরোনো পদ্ধতি বদলে সংসদের দুই কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটের বিধান কার্যকর করার দাবিই হওয়া উচিত ছিল আসল রাজনৈতিক লড়াই। অথচ সেই দাবি তোলার সময় বিরোধী দলের গলার জোর কোথায় হারিয়ে গেল?

    প্রার্থী ঠিক করতে যতটা তৎপরতা, নির্বাচনপদ্ধতি বদলাতে ততটাই নীরবতা—এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়।

    বিরোধী দলের উচিত ছিল এই দাবিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের বিষয়ে পরিণত করা। সভা-সমাবেশে বলা উচিত ছিল—দেখুন, এই সরকার জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে; রাষ্ট্র সংস্কারের নামে শুধু সময়ক্ষেপণ করছে। সরকারের আন্তরিকতা যাচাই এবং সত্যটি জনগণের কাছে তুলে ধরার জন্য এটি ছিল একটি বড় সুযোগ।

    অথচ বিরোধী দলও নীরব। আর এই নীরবতাই আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তুলে ধরে—আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা কি সত্যিই ব্যবস্থা বদলাতে চান? নাকি নিজেদের প্রার্থী বসাতে পারলেই তাঁরা সন্তুষ্ট? তাঁরাও কি অপেক্ষায় আছেন, নিজেদের পালা এলে সেই একই পুরোনো ক্ষমতার চেয়ারে বসবেন বলে?

    ব্যক্তি বদলালেই নতুন বাংলাদেশ তৈরি হয় না। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে ক্ষমতার কাঠামো ও নির্বাচনের পদ্ধতিও বদলাতে হবে। রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তিনি কোন পদ্ধতিতে নির্বাচিত হচ্ছেন, সেটি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। আপনি একটি ভিডিও বানালেন কিন্তু সে বিষয়টি বললেন না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।