মিশিগান প্রাইমারি যে বার্তা দিল, তা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক

মিশিগানের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য আবারও প্রমাণিত হলো—টাকার পাহাড়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত মানুষ জয়ী হতে পারে। নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়ে অকপট, অভিবাসী পরিবারের সন্তান এবং প্রতিষ্ঠিত দলীয় কাঠামোর বাইরের প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ কোটি কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার চাপ অতিক্রম করে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেছেন। তাঁর প্রতিপক্ষের পক্ষে বাইরের বিভিন্ন গোষ্ঠী পাঁচ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছিল; এর মধ্যে এআইপ্যাক-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ই ছিল তিন কোটি ডলারের বেশি।
বার্নি স্যান্ডার্স একে তাঁর দেখা আধুনিক আমেরিকান রাজনীতির সবচেয়ে অসাধারণ বিজয়গুলোর একটি বলে অভিহিত করেছেন। আর বিজয়ের রাতে এল-সায়েদ কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর কথা স্মরণ করে বলেছেন, “আমরা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছি।”
অবশ্য এটি তাঁর চূড়ান্তভাবে সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার বিজয় নয়। আগামী নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে তাঁকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সসহ অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। সেই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে যেতে পারবেন কি না।
তারপরও এই বিজয়কে ঘিরে যে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি দলীয় প্রাইমারির ফলাফলের কারণে নয়। এর মধ্যে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—বিপুল অর্থ, প্রতিষ্ঠিত দলীয় সমর্থন, পরিচয়ভিত্তিক ভয় এবং নেতিবাচক প্রচারণা সব সময় জনগণের বিচারবোধকে পরাজিত করতে পারে না। বাংলাদেশেরও এই বার্তা মনোযোগ দিয়ে শোনা দরকার—হতাশা নিয়ে নয়, আশা নিয়ে।
অর্থের পাহাড় সব সময় জেতে না
এ নির্বাচনে অর্থের ভূমিকা ছিল অস্বাভাবিকভাবে বড়। স্টিভেন্সকে সমর্থনকারী বিভিন্ন গোষ্ঠী বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে; বিশেষ করে এআইপ্যাক ও তার সহযোগীদের ব্যয় মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের পরিমাণ যত বেড়েছে, ততই প্রশ্ন উঠেছে—এই অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং এর বিনিময়ে কোন নীতির প্রতি আনুগত্য প্রত্যাশা করা হচ্ছে?
এল-সায়েদ সেই প্রশ্নটিকেই রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন। তাঁর প্রচারণা বড় দাতাদের অর্থের চেয়ে স্বেচ্ছাসেবক, ছোট অনুদান, সরাসরি যোগাযোগ এবং জনসমর্থনের ওপর বেশি নির্ভর করেছে। দরজায় দরজায় যাওয়া, ফোন করা, প্রতিবেশীকে বোঝানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তি তুলে ধরার মাধ্যমে তাঁর সমর্থকেরা প্রচারণাকে মানুষের আন্দোলনে রূপ দেন। এতে প্রমাণ হয়েছে, অর্থ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই নির্বাচনের একমাত্র নিয়ামক নয়।
বাংলাদেশে নির্বাচনী অর্থের প্রভাব আরও অস্বচ্ছ। কে কত টাকা ব্যয় করছে, অর্থের উৎস কী, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা অপরাধী চক্র কোন প্রার্থীকে সহায়তা করছে—এসবের নির্ভরযোগ্য হিসাব সাধারণত জনগণ জানতে পারে না। ফলে নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। মিশিগানের শিক্ষা কাজে লাগাতে হলে প্রার্থী ও দলের আয়-ব্যয়ের বাধ্যতামূলক প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা, গোপন অনুদান নিষিদ্ধ করা এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ অর্থের উৎস জানতে পারলে টাকার বন্যাও কখনো কখনো প্রার্থীর শক্তি না হয়ে দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
ট্যাগ নয়, নীতি দিয়ে বিচার
এল-সায়েদকে ‘অতি বামপন্থী’, ‘নির্বাচনযোগ্য নন’ এবং মূলধারার বাইরে থাকা প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। তাঁর মুসলিম ও আরব পরিচয়ও সংশয়ের আবহ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ভোটারদের একটি বড় অংশ তাঁর নাম বা ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, করপোরেট প্রভাব, গাজা এবং নির্বাচনী অর্থায়ন বিষয়ে তাঁর অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হয়ে উঠেছে ট্যাগিং। কাউকে ‘জঙ্গি’, ‘নাস্তিক’, ‘দেশবিরোধী’, ‘বিদেশি দালাল’, ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ে বন্দী করে দিলে তার বক্তব্যের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এই কৌশল ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ—উভয় শিবির থেকেই ব্যবহৃত হয়। ফলে নীতির বিতর্ক সরে গিয়ে মানুষের পরিচয়, পোশাক, অতীত সম্পর্ক বা সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ঘৃণা তৈরি হয়।
একটি সুস্থ গণতন্ত্রে ধর্মীয় দলকেও তার রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মসূচি, নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার, গণতন্ত্র ও সংবিধান সম্পর্কে অবস্থানের জবাব দিতে হবে। একইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে কোনো ব্যক্তি বা দলকে প্রমাণ ছাড়া উগ্রবাদী বা রাষ্ট্রবিরোধী ঘোষণা করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সমালোচনা হবে নীতি, কর্মকাণ্ড ও প্রমাণের ভিত্তিতে; পরিচয় বা কল্পিত ভয়কে ভিত্তি করে নয়।
নীতিতে অবিচলতার মূল্য
গাজা ও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে এল-সায়েদের অবস্থান তাঁর জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করেছিল। তিনি জানতেন, এআইপ্যাকের প্রভাব ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করলে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো তাঁর বিরুদ্ধে নামবে। তারপরও তিনি অবস্থান বদলাননি। তাঁর সব নীতির সঙ্গে একমত না হয়েও ভোটাররা অন্তত দেখেছেন, চাপের মুখে তিনি নিজের বক্তব্য পরিত্যাগ করেননি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর বিপরীত দৃশ্য খুব পরিচিত। ক্ষমতার বাইরে থাকলে সংস্কার, সুশাসন ও গণতন্ত্রের কথা বলা হয়; ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে একই নেতা পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীতে পরিণত হন। নীতির পরিবর্তন কখনো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু স্বার্থের কারণে অবস্থান বদলে জনসমক্ষে আদর্শের অভিনয় করলে জনগণের আস্থা ধ্বংস হয়। মিশিগানের বার্তা হলো—নীতিগত দৃঢ়তা সব সময় নির্বাচনী বোঝা নয়; বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা গেলে সেটিই বড় রাজনৈতিক সম্পদ হতে পারে।
কোনো একক পরিচয়ে জাতীয় নেতৃত্ব হয় না
এল-সায়েদের বিজয়ে মিশিগানের মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁর বিজয় শুধু একটি সম্প্রদায়ের ভোটে আসেনি। তরুণ, শ্রমজীবী, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রগতিশীল, আফ্রিকান-আমেরিকান এবং করপোরেট রাজনীতিতে অসন্তুষ্ট নানা শ্রেণির মানুষ তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নিজের পরিচয়ের মানুষের সমর্থন প্রয়োজন হলেও বৃহত্তর জনজীবনের সমস্যা নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি ছাড়া জাতীয় পর্যায়ের বিজয় সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শুধু ধর্মীয়, পারিবারিক, আঞ্চলিক বা ঐতিহাসিক পরিচয়ের ভোটব্যাংক নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নেতৃত্ব গড়া যায় না। একটি দলকে এমন রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, যেখানে তার সমর্থক নয় এমন নাগরিকও নিরাপদ থাকবে, ন্যায়বিচার পাবে এবং সমান মর্যাদা ভোগ করবে। রাজনৈতিক ঐক্য মানে মতপার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং ভিন্নমতের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার।
চরিত্রহনন ও ক্যাডার-সহিংসতার দায় কার
বাংলাদেশে ট্যাগিং শুধু ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অনেক সময় মাঠপর্যায়ের হামলার পরিবেশ তৈরি করে। প্রথমে প্রতিপক্ষকে দেশদ্রোহী, জঙ্গি বা জনগণের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এরপর দলীয় ক্যাডার সভা-সমাবেশে বাধা দেয়, মিছিল আক্রমণ করে, ভয়ভীতি দেখায় কিংবা শারীরিকভাবে আহত করে। কিন্তু বিচারের সময় প্রায়ই শুধু নিচের সারির কয়েকজন কর্মীকে সামনে আনা হয়; নির্দেশদাতা, অর্থদাতা এবং রাজনৈতিক গডফাদাররা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই দায়মুক্তিই সহিংসতাকে লাভজনক রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত করে।
এ অবস্থা বদলাতে একটি কার্যকর রাজনৈতিক আচরণবিধি আইন প্রয়োজন। এতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাধা, সংগঠিত হামলা, সহিংসতার উসকানি, প্রমাণিত মিথ্যা অপবাদ এবং রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার দায় স্পষ্ট করতে হবে। শুধু হামলাকারী নয়, পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও নির্দেশদাতাকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দলীয় পদ ধারণ, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুযোগ স্থগিত করার বিধান থাকতে পারে।
তবে এ আইন যেন মতপ্রকাশ দমন বা বিরোধী দলকে নিপীড়নের অস্ত্র না হয়। কঠোর সমালোচনা এবং প্রমাণিত মিথ্যা অপবাদ এক বিষয় নয়; রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং সহিংস উসকানিও এক নয়। তাই তদন্ত হতে হবে স্বাধীন, বিচারিক তত্ত্বাবধানে এবং ক্ষমতাসীন-বিরোধী নির্বিশেষে সমানভাবে। রাজনৈতিক নেতারা যখন বুঝবেন ক্যাডার ব্যবহার করলে শুধু কর্মী নয়, তাঁদের নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও ঝুঁকিতে পড়বে, তখন পেশিশক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা অনেকটাই কমবে।
সংগঠিত নাগরিকই শেষ ভরসা
মিশিগানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শেষ পর্যন্ত নাগরিক সংগঠনের শক্তি। নির্বাচন শুধু দল, প্রশাসন ও ধনী দাতাদের বিষয় নয়। সাধারণ মানুষ নিষ্ক্রিয় থাকলে সেই শূন্যস্থান অর্থশক্তি, ক্যাডার, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও প্রচারণার কারিগরেরা দখল করে নেয়। কিন্তু নাগরিকেরা প্রশ্ন করলে, অর্থের উৎস খুঁজলে, প্রার্থীর অতীত যাচাই করলে এবং প্রতিবেশীকে সংগঠিত করলে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারে।
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য শুধু ভালো প্রার্থী বা ভালো আইনের অপেক্ষা যথেষ্ট নয়। নাগরিকদেরও দলীয় অন্ধ আনুগত্যের বাইরে গিয়ে নীতি, চরিত্র ও কাজের হিসাব চাইতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে নিজের দলের অপরাধ হলেও প্রতিবাদ করতে হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রতিশ্রুতি মনে রাখতে হবে এবং নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়েও জবাবদিহি দাবি করতে হবে।
এল-সায়েদের সামনে চূড়ান্ত পরীক্ষা এখনো বাকি। নভেম্বরে তিনি জয়ী হবেন কি না, কিংবা নির্বাচিত হলে নিজের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবু তাঁর প্রাইমারি বিজয় একটি সম্ভাবনা দেখিয়েছে: বিপুল অর্থ, প্রতিষ্ঠিত শক্তি এবং পরিচয়ভিত্তিক ভয় সব সময় শেষ কথা নয়।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি তাই কোনো বিশেষ দল বা ধর্মীয় পরিচয়ের বিজয়ের সূত্র নয়। বার্তাটি আরও গভীর—রাজনীতি যখন ট্যাগের বদলে নীতি, অর্থের বদলে সংগঠিত জনশক্তি, ক্যাডারের বদলে আইনের শাসন এবং ভয়ের বদলে নাগরিক বিচারবোধের ওপর দাঁড়ায়, তখন পরিবর্তন অসম্ভব থাকে না।