| |

আমরা কারা ??

📚 সংলাপ আর্কাইভ

মূল লেখক: মুনিম সিদ্দিকী
প্রথম প্রকাশ: সংলাপ ব্লগ, 2012

লেখাটি সংলাপ ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও প্রকাশকাল সংরক্ষণ করে চিন্তা ও সংলাপ-এর আর্কাইভে পুনঃপ্রকাশের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।


আমরা কারা ? আমাদের সত্যিকার পরিচয় কি ? আমরা কি গভীরভাবে কখনো তলিয়ে দেখেছি কোথায় আমাদের উৎস ? না ভিনদেশীদের সারিবাদি সালসা খেয়ে, চিলে কান নেবার মত কান নিলো, কান নিলো বলে চিৎকার দিয়ে চলেছি ? আসুন চোখের ঠুলি ফেলে দিয়ে একবার দেখুন ইতিহাসের পাতার গরমিল ! আমাদের পিতা-প্রপিতামহের ইতিহাস অন্বেষণ করে দেখুন, হতভম্ব হয়ে যাবেন, চিন্তাধারা বাধাগ্রস্ত হবে, ইতিহাসের অনেক জোড়াতালি দেখতে পাবেন । স্বাধীনতার এই ৪০ বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে এত টানাটানি হয়েছে যা আমাদের সব প্রাপ্তিকে ম্লান করে দিচ্ছে । চেতনাকে চিহ্নিত করতে হলে আমরা কারা তা প্রথমতঃ চিহ্নিত করতে হবে, এখানে কোন গোঁজামিল দিলে চলবে না । তাই আসুন দেখি আমরা কারা ? যে ভৌগলিক সীমা রেখায় আমাদের অবস্থান, সেই বিশ্বের সর্ব বৃহৎ বদ্বীপ গাঙ্গেয় এলাকাকে বঙ্গ বলে আর এই বঙ্গ শব্দটি পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি শব্দ। বঙ থেকে বঙগ এর উৎপত্তি এর অর্থ জলাশয় অর্থাৎ নদীমাতৃক এলাকা । এই শব্দের প্রাচীনত্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছরের । ইতিহাসের চাঞ্চল্যকর উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে কখনো বঙ্গদেশ, বঙ্গীয় এলাকা, বঙ্গ প্রদেশ, বাঙ্গাল সরকার, বাঙ্গাল মুলুক, বাঙ্গালা প্রেসিডেন্সী, পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান, আর এখন বাংলাদেশ । জনগোষ্ঠীর কথা-শুরু দ্রাবিড় ও আষ্ট্রিক সভ্যতা থেকে এরপর বৌদ্ধ সভ্যতা । আমাদের এই পূর্ব বঙ্গে আর্যরা কোন সময়ে সমাদৃত হয়নি। বরং আমাদের এই জনগোষ্ঠী বহিরাগত আর্যদের বিরুদ্ধে শতাব্দী পর শতাব্দী যুদ্ধ করেছে । নবদ্বীপ কেন্দ্রিক অবাঙালী, কর্ণাটকিয়,সেন বংশের শাসনকে কিছুতে মেনে নেয়নি । আর এই সন্ধিক্ষণে ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে মুসলিম শাসকদের আগমন, শুধু শাসক বৃন্দ নয় সাথে মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন সূফী সাধকদের আগমন হয় । যুগের পর যুগ এই শত শত সাধকদের অক্লান্ত চেষ্টায় এই অঞ্চলের গণমানুষের বিশাল অংশ সূফীদের প্রচারিত জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সুফিদের এই বিরাট সাফল্যের একটাই কারণ সুফিরা তাদের মতবাদ প্রচারের সময় স্থানীয় কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতি ও লোকাচার, স্থানীয় ভাষা ও সাহিত্যকে গ্রহণ করেছিলেন বিশাল হৃদয় দিয়ে । আর এর ফলেই পূর্ব বাংলায় স্থানীয় কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতি ও সভ্যতার সঙ্গে সূফী দর্শনের সমন্বয় এবং স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের ভাষা সাহিত্য এবং জাতিয় জীবনে তার প্রতিফলন হয় । ইংরেজদের আগমনের বহু পূর্বে বাংলার মুসলিম সুলতানরা যুগের পর যুগ যে ভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন, তা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় । এর পাশাপাশি শতাব্দীর পর শতাব্দী শত শত সূফীদের নিরলস প্রচেষ্টায় জন্ম সূত্রে মুসলমান, ধর্মান্তরিত মুসলমান এবং স্থানীয় দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে নিবিড় একাত্মতা সৃষ্টি হয় যার ফলে এক নয়া বাঙ্গালী দর্শনের ভ্রূণ সৃষ্টি আর এখান থেকেই সূচনা হয় অপরাপর বাঙ্গালীদের থেকে ভিন্ন এক বাঙ্গালী জাতির । উদারপন্থী সুফীইজমের প্রেমময় দর্শনের প্রভাবে এই নতুন দর্শন দ্রুত প্রসার লাভ করে। ফলে বাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক গভীর আস্থা সৃষ্টি করেছিল । সূফীরা শিখিয়ে ছিলেন, এই দেশ এই মাটি আমার, এই ভাষা এই সাহিত্য আমার,এই লোকাচার এই সংস্কৃতি আমার, আমি এ মাটিরই সন্তান । এ ভূখণ্ডের অধিবাসীরা যেমন আর্যদের অধীনতা মেনে নেয়নি তেমনি মোগলদের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করেছে । সাতচল্লিশের মধ্য আগস্টে গাঙ্গেয় বদ্বীপ থেকে আর্যদের উত্তরসূরিরাই দেশত্যাগ করেছিলেন । একাত্তরের ঐতিহাসিক পট-পরিবর্তনে শরাফত খানদানী দাবিদার অবাঙ্গালীরাও এদেশ ত্যাগে বাধ্য হন । আমাদের এই জাতীয়তাবাদকে ইসলামী চেতনা বলা যেমনি উচিত হবে না তেমনি মৌলবাদী বলাও উচিত হবে না । আজকে আমরা কারা ? এ প্রশ্ন করতেই বলতে হয় যে স্বাধীনতার পর আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকী রয়ে গেছে । সে কাজ হচ্ছে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ছাড়াও আমরা কারা তা নির্ণয় করা । আমাদের জাতীয়তা নানা উপকরণের সমন্বয়ে গড়া, এই সম্পূরক উপকরণের কোনটাই আজ আর বর্জন করা যাবেনা, আর এই চৌহদ্দি থেকেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে । বি.দ্র. এম আর আক্তার মুকুলের গয়রহ বই থেকে সংকলিত

Share:

Similar Posts