ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কবলে বাংলাদেশ
ভূমিকা
একবার ভাবুন তো। একাত্তরে আমরা রক্ত দিয়ে পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র পেলাম। চব্বিশের জুলাইয়ে আবার রক্ত দিয়ে সেই রাষ্ট্রকেই ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে মুক্ত করতে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। দুই প্রজন্ম, দুই সময়—কিন্তু আকুতি একই: ন্যায়বিচার, মুক্তি, এমন একটি দেশ যেখানে ক্ষমতা মানে নিপীড়নের লাইসেন্স নয়।
তাহলে প্রশ্ন এখানেই—এত রক্ত, এত ত্যাগের পরও কেন আমরা বারবার একই জায়গায় ফিরে আসি? কেন সরকার বদলের পরও থানার কর্মকর্তা দ্রুত বুঝে যান আইনের কথায় নয়, কার কথায় নড়তে হবে?
এটি আজ আমাদের সবচেয়ে জরুরি ও অস্বস্তিকর রাজনৈতিক প্রশ্ন। যে দল বিরোধী দলে থেকে নিরপেক্ষ প্রশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও অবাধ নির্বাচনের দাবি তোলে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই দলই কেন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়?
দল বদলায়, ক্ষমতার স্বভাব বদলায় না
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে আমরা সহজ করে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির লড়াই হিসেবে দেখি। কিন্তু সমস্যা আরও গভীরে। আমাদের রাজনীতিতে নির্বাচন প্রায়ই শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিযোগিতা থাকে না, রাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। ক্ষমতায় যাওয়া মানে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার, পুলিশকে রাজনৈতিক সুবিধায় ব্যবহার, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অনুগত লোক বসানো—এমন ধারণা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দৃঢ়মূল হয়ে গেছে। ফলে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে জনগণের নয়, ক্ষমতাসীন দলের সম্পত্তি।
বিএনপির ইতিহাসও কাঠগড়ার বাইরে নয়
এই রোগ শুধু আওয়ামী লীগের ওপর চাপালে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। বিএনপির আমলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক সুবিধায় প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। ২০০৪ সালের চতুর্দশ সংশোধনী এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত দৃষ্টান্ত। এই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়েছিল। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল—এর ফলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে. এম. হাসান পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পথ সুগম করে নিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত এই অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও এর ক্ষত মিলিয়ে যায়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতার ওপর মানুষের যে আস্থা ছিল, তা ভেঙে পড়ে; আর ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর খাদে গিয়ে পড়ে।
এরপর আসে এক-এগারোর সরকার। এই সরকার গঠনের পেছনে বিদেশি শক্তির হাত ছিল কি না, তাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল কি না—এই প্রশ্ন বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় ঘুরেফিরে এসেছে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি নিজেই তাঁর আত্মজীবনীতে সে সময়ের বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা লিখে গেছেন। ফলে এই প্রশ্নগুলোকে নিছক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এরপর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, ক্ষমতায় আসে একটি দল। সেই সরকারের বয়স তখনো মাত্র কয়েক মাস—এমন সময়েই ঘটে যায় বিডিআর বিদ্রোহের সেই ভয়াবহ অধ্যায়। পিলখানায় নির্মমভাবে প্রাণ হারান বহু সেনা কর্মকর্তা। আর সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো, এই বিভীষিকা কোনো দূরবর্তী রণাঙ্গনে ঘটেনি—ঘটেছিল রাজধানীর বুকে, রাষ্ট্রেরই একটি সুরক্ষিত কম্পাউন্ডের ভেতরে।
অবরুদ্ধ সেনা কর্মকর্তারা প্রাণ বাঁচাতে সেনাপ্রধান ও সরকারের সর্বোচ্চ মহলে বারবার সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিলেন—এই বক্তব্য বহুবার সামনে এসেছে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী কেন সময়মতো এগিয়ে এল না, সেই প্রশ্ন আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনার এবং সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেছে।
একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীতে রাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত সেনা কর্মকর্তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকবেন, বাঁচার আকুতি জানাবেন—আর রাষ্ট্র তাঁদের বাঁচাতে ব্যর্থ হবে, এর চেয়ে লজ্জাজনক ব্যর্থতা আর কী হতে পারে? অন্য যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমন বিপর্যয়ের পর সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় নিয়ে ঝড় উঠত, পদত্যাগের দাবিও অস্বাভাবিক ঠেকত না। কিন্তু এখানে তা হয়নি। উল্টো সেই দলই পরবর্তী তিনটি নির্বাচন কারচুপি করে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে হাতিয়ার বানিয়ে কীভাবে একটি স্বৈরাচারী, মাফিয়াতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তুলেছিল, তা আজ দেশে-বিদেশে দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত সেই দলের নেতৃত্বকে পালাতে হয়েছে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার সামনে থেকে।
এই গোটা ইতিহাস থেকে শিক্ষা একটাই—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক বিধান আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যখন দলীয় স্বার্থ কিংবা দেশি-বিদেশি ক্ষমতার সমীকরণের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন ক্ষতি হয় শুধু একটি সরকারের নয়—ভেঙে পড়ে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা।
শেখ হাসিনার হাতে ফ্যাসিবাদী রূপ
তবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপা যাবে না। শেখ হাসিনার শাসনামলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি যে ব্যাপ্তি ও নিষ্ঠুরতা লাভ করেছিল, তা আলাদাভাবে বিচার করার দাবি রাখে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, প্রতিপক্ষ দমন, নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সংকুচিত করা—শাসনব্যবস্থা ক্রমে ফ্যাসিবাদী চরিত্র নেয়। পরবর্তী তদন্তে উঠে এসেছে, তাঁর সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জোরপূর্বক গুম রাষ্ট্রীয় দমনের পদ্ধতিগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। তদন্ত কমিশনে প্রায় দুই হাজার অভিযোগ জমা পড়ে, দেড় হাজারের বেশি ঘটনা গুমের সংজ্ঞায় পড়ে। এর সঙ্গে সামনে এসেছে “আয়নাঘর” নামে গোপন আটককেন্দ্র, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও “ক্রসফায়ার”-এর অভিযোগ। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে এই ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকাশ ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ডেকে আনে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় শিক্ষা—ফ্যাসিবাদ একদিনে তৈরি হয় না। এর শুরু ছোট জায়গা থেকে: প্রতিপক্ষকে সহ্য না করা, দলীয় কর্মীর অপরাধে প্রশ্রয়, পুলিশ-প্রশাসনকে রাজনৈতিক আনুগত্যে অভ্যস্ত করা।
বর্তমান বিএনপি কি সেই পথেই যাচ্ছে?
আওয়ামী লীগের পতনের পর ও ২০২৬-এর নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে বিএনপির সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ ছিল—রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে দেখানোর। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করছে। ২৮ জুলাই হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচির পর দলটির নেতাদের গাড়িবহরে হামলা হয়; এনসিপি স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ কয়েকজন আহত হন। দায় তদন্তেই নির্ধারিত হওয়া উচিত, তবে ক্ষমতাসীন দল-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি—দ্রুত ও দৃশ্যমান তদন্ত নিশ্চিত করা।
উদ্বেগ আছে গুমবিরোধী আইনি কাঠামো নিয়েও। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশ নির্বাচিত সরকারের আমলে আইনে পরিণত না হওয়া এবং স্বাধীন তদন্তক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রকাশ করেছে। যে দেশ “আয়নাঘর” দেখেছে, সেখানে গুম তদন্তের ক্ষমতা দুর্বল করার যেকোনো উদ্যোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
শিক্ষাঙ্গনেও পুরোনো আধিপত্যের ছায়া?
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষ ঘটেছে—আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও। এসব হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের দখলদার ও সহিংস ক্যাম্পাস-রাজনীতির পরিণতি বাংলাদেশ দেখেছে। শুধু সংগঠনের নাম বদলে আধিপত্য ও সংঘর্ষের সংস্কৃতি থেকে গেলে জুলাইয়ের মূল শিক্ষাই ব্যর্থ হবে। রাষ্ট্রের একমাত্র প্রশ্ন হওয়া উচিত: কে আইন ভেঙেছে—ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন হোক বা অন্য কোনো সংগঠন, একই আইন প্রয়োগ করতে হবে।
ইসলামী ব্যাংক বিতর্ক ও একটি মন্তব্য
সংসদে অভিযোগ উঠেছে, ইসলামী ব্যাংকে আবার এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে। সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই হওয়া প্রয়োজন, তবে প্রশ্নটি মূল বিষয়েরই অংশ—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুযায়ী চলবে, নাকি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ইচ্ছায়? এই প্রেক্ষাপটে এনসিপির সারোয়ার তুষারের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ: “আওয়ামী লীগ হচ্ছে সফল বিএনপি, আর বিএনপি হচ্ছে ব্যর্থ আওয়ামী লীগ।” কথাটি আক্ষরিক সত্য নয়, দুই দলকে অভিন্নও বলা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই—বিএনপি কি আওয়ামী লীগের পতন থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির দিকে এগোবে? উদ্বেগের জায়গা গন্তব্য নয়, যাত্রাপথের দিক।
রাষ্ট্রের কর্মচারী, না দলের অনুগত?
ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির জন্য প্রয়োজন অনুগত প্রশাসনিক সংস্কৃতি। একজন সরকারি কর্মকর্তা কোনো সরকারের ব্যক্তিগত কর্মচারী নন—তিনি রাষ্ট্রের কর্মচারী, জনগণের সেবক। প্রশাসন-পুলিশে পদোন্নতির মাপকাঠি হওয়া উচিত পেশাগত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা, কোনো দলের প্রতি বশ্যতা নয়।
কিন্তু বিচার করবে কে? দলীয়করণের তদন্ত যদি আবার ক্ষমতাসীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন লোকেরাই করেন, সমাধান হবে না—বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নতুন দরজা খুলবে। “তোষামোদকারী” বা “দলীয় লোক”—এমন অস্পষ্ট বিশেষণ শাস্তির ভিত্তি হতে পারে না। শাস্তির ভিত্তি হতে হবে প্রমাণযোগ্য আচরণ, আর তা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন আইনে সুরক্ষিত স্বাধীন পেশাগত শৃঙ্খলা ব্যবস্থা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও আপিলের ব্যবস্থা। এক দলের তোষামোদকারীকে সরিয়ে আরেক দলের তোষামোদকারী বসানো সমাধান নয়—রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে তোষামোদের প্রয়োজনটাই তুলে দিতে হবে।
স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কি ক্ষমতা কমায়?
আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের গভীর ভুল ধারণা—প্রতিষ্ঠান স্বাধীন হলে সরকারের ক্ষমতা কমে। বাস্তবে উল্টো। নিরপেক্ষ পুলিশ আজ ক্ষমতাসীন দলের অপরাধীকে ছাড় দেবে না, কিন্তু কাল সেই দল বিরোধী দলে গেলে একই পুলিশ তাকে হয়রানিও করতে পারবে না। স্বাধীন আদালত আজ সরকারের বেআইনি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারে, কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সেই আদালতই আজকের শাসককে ভবিষ্যৎ প্রতিহিংসা থেকে রক্ষা করবে। অর্থাৎ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কোনো দলের শত্রু নয়—ক্ষমতাসীন ও বিরোধী, উভয়ের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক বীমা।
সবচেয়ে বড় লাভবান হবে সাধারণ মানুষ। নিরপেক্ষ পুলিশ, স্বাধীন আদালত, পেশাদার প্রশাসন ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন থাকলে নাগরিককে আর দলীয় পরিচয় খুঁজতে হবে না। রাষ্ট্র তখন আওয়ামী লীগের নয়, বিএনপির নয়, জামায়াতের নয়, এনসিপিরও নয়—রাষ্ট্র হবে নাগরিকের।
দলগুলোরও এতে স্বার্থ আছে, কারণ ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ পুলিশকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানালে কাল সেই অস্ত্র অন্য কারও হাতে যাবে। বিপরীতে, আজ যদি একটি দল এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে যা নিজের অন্যায়ও ঠেকাতে পারে, ক্ষমতা হারানোর পর সেই প্রতিষ্ঠানই তার অধিকার রক্ষা করবে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তাই কোনো সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়—দীর্ঘমেয়াদে সেটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক নিরাপত্তা।
সরকার নয়, বদলাতে হবে ক্ষমতার চরিত্র
একাত্তর আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে। চব্বিশের জুলাই প্রমাণ করেছে—অন্যায়-দমনের সীমা অতিক্রম করলে মানুষ রাস্তায় নামে, জীবনও দেয়। কিন্তু শুধু সরকার পতন বা ক্ষমতার হাতবদলে রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি না বদলালে প্রতিটি পরিবর্তনের পর আমরা একই জায়গায় ফিরে যাব। শুধু ক্ষমতার মালিক বদলালে বাংলাদেশের মৌলিক রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে না।
আমাদের এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা দরকার যেখানে যে দলই ক্ষমতায় আসুক—পুলিশ, প্রশাসন, আদালত, নির্বাচন কমিশন কারও নয়, এগুলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এবং চলবে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী। এতে ক্ষমতাসীন দল কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধা হারাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে সব পক্ষ—সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশের জনগণ।
কারণ সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে—যদি আমরা তাদের টিকে থাকতে দিই। একাত্তরের চেতনা ও চব্বিশের আকাঙ্ক্ষাকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে হলে শুধু শাসক বদলালে হবে না; বদলাতে হবে ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা। রাষ্ট্রকে দলের অধীন নয়—দলকে রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানের অধীন করতে হবে। বাংলাদেশ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির এই পুরোনো অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার পথ খুঁজে পাবে সেদিনই।
তথ্যসূত্র ও যাচাই
1. Banglapedia — Constitutional Amendments (চতুর্দশ সংশোধনী)
https://en.banglapedia.org/index.php/Constitutional_Amendments
2. The Daily Star — 2006 caretaker government crisis and K. M. Hasan
https://www.thedailystar.net/2006/10/28/d6102801044.html
3. Human Rights Watch — Enforced disappearances, accountability and non-recurrence, 26 May 2026
https://www.hrw.org/news/2026/05/26/bangladesh-ensure-justice-reparation-for-victims-and-guarantees-of-non-recurrence
4. Human Rights Watch — Commission of Inquiry on Enforced Disappearances and secret detention sites
https://www.hrw.org/news/2025/06/16/bangladesh-extend-the-mandate-of-the-commission-of-inquiry-on-enforced
5. The Business Standard — NCP July March attacked in Habiganj, 28 July 2026
https://www.tbsnews.net/bangladesh/politics/ncps-july-march-attacked-habiganj-sarjis-nasiruddin-injured-1500481
6. Prothom Alo — Student clashes at multiple Dhaka institutions, August 2026
https://www.prothomalo.com/bangladesh/capital/iqo5834t3m
7. Ittefaq — ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্টদের ফেরানোর অভিযোগ
https://www.ittefaq.com.bd/792802/
8. Ittefaq — সারোয়ার তুষারের “সফল বিএনপি/ব্যর্থ আওয়ামী লীগ” মন্তব্য, 9 April 2026
https://www.ittefaq.com.bd/783605