বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি
একটি সম্মিলিত নাগরিক আবেদন · দ্বিতীয় পর্ব
জনাব প্রধানমন্ত্রী,
একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।
শেখ হাসিনার শাসনের অবসান হয়েছে। কিন্তু যে ব্যবস্থায় তাঁর হাতে এত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে পেরেছিল, সেই ব্যবস্থা কি পাল্টেছে?
গত বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, নয়া দিগন্তে প্রকাশিত আপনাকে লিখা আমাদের প্রথম চিঠিতে আমরা বলেছিলাম—একসঙ্গে সব সংস্কার করতে হবে না। কিন্তু প্রতি মাসে অন্তত একটা কাজ শুরু করুন, যাতে মানুষ দেখতে পায় সরকার শুধু বদলায়নি, রাষ্ট্র চালানোর পদ্ধতিটাই বদলাচ্ছে। প্রথম মাসে বলেছিলাম বিচারব্যবস্থা আর বাজার-জ্বালানি তদারকির কথা।
আজ দ্বিতীয় মাসের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। বিষয় একটাই—
পুলিশ।
যে প্রশ্নটা সবচেয়ে জরুরি
আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরবে কি না—সেটা বড় প্রশ্ন নয়।
বড় প্রশ্ন হলো: শেখ হাসিনার মতো আরেকজন কি আবার তৈরি হতে পারবেন?
জুলাইয়ের ঐতিহাসিক অসাধারণ গণ অভ্যুত্থান একটা সরকারকে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু যে মাটিতে কর্তৃত্ববাদ জন্মায়, সেই মাটি অক্ষত থাকলে নতুন একজন শেখ হাসিনা তৈরি হতে সময় লাগবে না। রোগের জীবাণু যেমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সহজে ছড়ায়, তেমনি দুর্বল ও দলীয়কৃত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান স্বৈরাচারের জন্য আদর্শ উর্বর জমি।
বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পুলিশকে প্রতিপক্ষ দমনে লাগানো যায়। প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের কথায় ওঠাবসা করে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো কার্যকর প্রতিকার নেই। এই চারটা জিনিস ঠিক থাকলে একজন ব্যক্তিকে সরালেও একই শাসন আবার ফিরে আসবে—শুধু মুখ বদলাবে।
তাই আমাদের দাবি শুধু শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের অপরাধের বিচার নয়। আমাদের দাবি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় কোনো শেখ হাসিনার উত্থানই কঠিন হয়ে পড়ে—যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করে স্বৈরশাসন কায়েম করতে না পারে। আর এখানেই পুলিশ সংস্কারের গুরুত্ব।
ঔপনিবেশিক পুলিশ, স্বাধীন দেশ
একটা তথ্য জানলে অবাক হবেন—বাংলাদেশ পুলিশ এখনো মূলত চলে ১৮৬১ সালের Police Act দিয়ে। আইনটি তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে, যখন পুলিশের প্রধান ভূমিকা ছিল শাসনব্যবস্থার কর্তৃত্ব বজায় রাখা। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের দর্শন হওয়া উচিত তার ঠিক উল্টো।
পুলিশ শাসকের বাহিনী নয়। পুলিশ আইনের বাহিনী।
এই লক্ষ্যে যাওয়ার পথ জুলাই সনদেই লেখা আছে। সনদের ৬৯ নম্বর প্রস্তাবে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশনের কথা বলা হয়েছে—৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট এতে একমত হয়েছিল। উদ্দেশ্য: পুলিশকে পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব করা এবং অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা।
তারপর কী হলো?
অন্তর্বর্তী সরকার ৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ Police Commission Ordinance জারি করেছিল। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির শুরু ছিল, কিন্তু কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিয়ে তখনই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। পরে সংসদ সংবিধানসম্মত সময়সীমার মধ্যে এটিকে আইনে রূপ দেয়নি; ফলে ১১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারায়।
তো আমাদের প্রশ্ন সহজ— আর কত অপেক্ষা?
আমাদের দাবি কী
আগামী মাসেই সংসদে একটি শক্তিশালী স্বাধীন পুলিশ কমিশন বিল আনুন। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের কার্যকর দিকগুলো রাখুন, যে দুর্বলতাগুলো নিয়ে আপত্তি উঠেছিল সেগুলো শুধরে নিন, আর জুলাই সনদের অঙ্গীকারকে স্থায়ী আইনে রূপ দিন।
কিন্তু শুধু নামে “স্বাধীন” লিখলে চলবে না। আমরা চাই—
• রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, আইনের প্রতি আনুগত্য। মন্ত্রী, এমপি, সরকারি বা বিরোধী দলের নেতা—যেই হোন, আইনের প্রয়োগে পুলিশের আচরণ বদলাবে না। ক্ষমতাবান ব্যক্তি কোনো বিশেষ সুবিধা পাবেন না, আবার সাধারণ নাগরিকও কোনো অন্যায় আচরণের শিকার হবেন না।
• অন্যায় আদেশ প্রত্যাখ্যানের অধিকার। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বেআইনি রাজনৈতিক নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করলে তাঁকে বদলি, পদাবনতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না—এটাও পুলিশের স্বাধীনতার অংশ।
• নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতিতে রাজনীতি নয়, যোগ্যতা। কমিশনের সদস্য নিয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ ও বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়ায়। মেয়াদ, অপসারণ ও বাজেট এমনভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে, যাতে সরকার অসন্তুষ্ট হলেই কমিশনকে অকেজো করে দিতে না পারে।
স্বাধীনতা মানে জবাবদিহিহীনতা নয়।
পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার মানে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া নয়। নির্যাতন, বেআইনি আটক, ঘুষ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের জন্য পুলিশের বাইরে একটি সত্যিকার স্বাধীন ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কারণ একটা সহজ সত্য—নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের একমাত্র তদন্তকারী নিজেই হতে পারে না।
অন্যান্য দেশের কয়েকটি উদাহরণ আছে। কানাডার অন্টারিওতে Special Investigations Unit পুলিশের সঙ্গে জড়িত গুরুতর কিছু ঘটনা তদন্ত করে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে Independent Office for Police Conduct, নিউজিল্যান্ডে Independent Police Conduct Authority এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে Police Ombudsman পুলিশের বাইরে স্বাধীন তদারকি বা তদন্তের ভূমিকা পালন করে। তাদের ক্ষমতার পরিধি এক নয়, কিন্তু নীতিটা একই—গুরুতর অভিযোগের বিচার শুধু অভিযুক্ত বাহিনীর নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশকে কারো নকল করতে হবে না। কিন্তু নীতিটা ধার করতে দোষ নেই—যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকেই নিজের একমাত্র তদন্তকারী বানানো যাবে না।
আমাদের কমিশনের হাতে নথি চাওয়া, সাক্ষী ডাকা এবং গুরুতর অভিযোগে স্বাধীন তদন্ত শুরু বা নিশ্চিত করার কার্যকর ক্ষমতা থাকতে হবে। শুধু “সুপারিশ” করে দায়িত্ব শেষ করলে এটাও আরেকটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
প্রশিক্ষণ আর পুরনো আইন
আইন বদলালেই কাজ শেষ নয়। পুলিশ সদস্যদের মানসিকতাও বদলাতে হবে। মানবাধিকার, নাগরিকের মর্যাদা, বলপ্রয়োগের সীমা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা—এসব প্রশিক্ষণের স্থায়ী অংশ হোক। একবার প্রশিক্ষণ দিয়ে ছেড়ে দিলে চলবে না; নিয়মিত পুনঃপ্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন দরকার।
একই সঙ্গে ১৮৬১ সালের Police Act-এর পরিবর্তে একটি যুগোপযোগী পুলিশ আইন প্রণয়নের কাজ শুরু হোক। ২০২৫ সালের সংস্কার-আলোচনাতেও কমিশন গঠনের পর দ্রুত একটি আধুনিক Police Act তৈরির প্রস্তাব ছিল। একটি উপনিবেশ শাসনের জন্য বানানো আইন দিয়ে স্বাধীন দেশের পুলিশব্যবস্থা অনির্দিষ্টকাল চালানো উচিত নয়।
মানবাধিকার কমিশনকেও শক্তিশালী করুন
এই মুহূর্তে আরেকটি কাজও সমান জরুরি।
২৭ আগস্ট সরকার সংসদে National Human Rights Commission Bill, 2026 তুলেছে। ২ সেপ্টেম্বর সংসদীয় কমিটি কিছু সংশোধনের প্রস্তাবসহ রিপোর্ট জমা দিয়েছে। কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বর Transparency International Bangladesh বলেছে—সংশোধনের পরও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন ও স্বার্থসংঘাতমুক্ত তদন্তের মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে।
বিলটি এখনো পাস হয়নি। এখনো সংশোধনের সুযোগ আছে।
গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন, বেআইনি আটক—এসব অভিযোগে মানবাধিকার কমিশনের নিজস্ব স্বাধীন তদন্তক্ষমতা থাকতে হবে। যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বাহিনীকেই দিয়ে তদন্ত করালে “স্বাধীন তদন্ত” কথাটার কোনো মানে থাকে না। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে পুলিশ কেন একমাত্র তদন্তকারী হবে? RAB বা অন্য কোনো বাহিনীর বেলায়ও একই প্রশ্ন।
কেন এটা শুধু কাগজের কথা নয়
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাব বলছে—২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১,২৮২ জন পরে ফিরে এসেছেন। অন্তত ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ এবং তাঁদের মৃত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আরও ৩৬ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। কমিশন নিজেই বলেছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
এই ইতিহাসের পর বাংলাদেশে কোনো পরিবারকে আর এই আতঙ্ক নিয়ে বাঁচতে দেওয়া যায় না যে—রাষ্ট্রের কোনো বাহিনী তাদের প্রিয়জনকে তুলে নিলে তারা জানতেও পারবেন না তিনি কোথায়।
আর এটা শুধু অতীতের গল্প নয়। ১০ এপ্রিল ২০২৬-এ মিরাজ শেখ নামের এক জেলেকে কোস্ট গার্ড সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছে বলে তাঁর পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন; কোস্ট গার্ড অভিযোগটি অস্বীকার করেছে। তিনি এখনো বাড়ি ফেরেননি। ১২ জুলাই হাইকোর্ট তাঁকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেয়। Human Rights Watch বলেছে, অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হলে এটি জুলাই ২০২৪-এর পর বাংলাদেশের প্রথম পরিচিত গুমের ঘটনা হতে পারে।
শিক্ষাটা স্পষ্ট—প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা তৈরি না হলে পুরনো পদ্ধতি ফিরে আসতে সময় লাগে না।
তাই আমরা শুধু অতীতের গুমের বিচার চাইছি না। আমরা চাই এমন একটা ব্যবস্থা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো সরকার চাইলেও গুম-নির্যাতনের সংস্কৃতি আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
একজন ক্ষমতাবান বনাম একজন রাষ্ট্রনায়ক
জনাব প্রধানমন্ত্রী,
এই প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করলে সেটা আপনার জন্য সবসময় সুবিধাজনক মনে হবে না। সরকার তখন ইচ্ছেমতো পুলিশ ব্যবহার করতে পারবে না। কোনো গুরুতর অভিযোগ সহজে চাপা দিতে পারবে না। এটাই সত্য।
কিন্তু এখানেই ক্ষমতাবান রাজনীতিক আর রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে পার্থক্য।
আজ যে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান আপনি তৈরি করবেন, সেটা আজ আপনার ক্ষমতার কিছুটা সীমিত করবে। কিন্তু কাল আপনি বা আপনার দল ক্ষমতায় না থাকলে, সেই একই প্রতিষ্ঠান আপনাদেরও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর অন্যায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করবে।
আজ প্রতিপক্ষকে যে অধিকার দেবেন, কাল সেটাই হতে পারে আপনার নিজের রক্ষাকবচ।
এটাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সৌন্দর্য—এটা কোনো একজনের বা একদলের জন্য তৈরি হয় না। এটা সবার জন্য সমান।
জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অর্জন তখনই স্থায়ী হবে, যখন আমরা শুধু একটা স্বৈরাচারী সরকারকে বিদায় দিয়েই সন্তুষ্ট থাকব না—কর্তৃত্ববাদ ফিরে আসার রাষ্ট্রীয় পথটাও বন্ধ করে দেব।
এই কাজটা আপনি করে যেতে পারলে ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়—বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ফেরার পথ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে যাওয়া একজন সংস্কারক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।
সম্মানিত পাঠক, আপনি সহমত হলে এই খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করুন
স্বাক্ষরকারীদের তালিকা
এখনও কেউ স্বাক্ষর করেননি।