বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দ্বিতীয় খোলা চিঠি
একটি সম্মিলিত নাগরিক আবেদন · দ্বিতীয় পর্ব
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
গত বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, নয়া দিগন্তে প্রকাশিত আমাদের প্রথম চিঠিতে আমরা বলেছিলাম—একসঙ্গে সব সংস্কার করতে হবে না, কিন্তু প্রতি মাসে অন্তত একটা কাজ শুরু করুন, যাতে মানুষ দেখতে পায় সরকার শুধু বদলায়নি, রাষ্ট্র চালানোর পদ্ধতিটাই বদলাচ্ছে। প্রথম মাসে আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বাজার ও জ্বালানি খাতে ডিজিটাল তদারকির প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আজ দ্বিতীয় মাসের প্রস্তাব—পুলিশ।
যে প্রশ্নটা সবচেয়ে জরুরি
আপনার দলের অনেকে হয়তো ভাবছেন—পুলিশকে দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করলে দেশ চালাবেন কীভাবে? এটি একটি মিথ্যা ধারণা (perception) । সুষ্ঠু শাসনের জন্য পুলিশকে দলীয়করণের কোনো প্রয়োজন নেই।
আপনি দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে ছিলেন—একটি গণতান্ত্রিক দেশে পুলিশ কীভাবে আইনের অধীনে, পেশাগত স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে, তা আপনি নিজ চোখে দেখেছেন। আমাদের বর্তমান পুলিশব্যবস্থা এসেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে, যার উদ্দেশ্য ছিল জনসেবা নয়—শাসকের ক্ষমতা রক্ষা ও প্রতিবাদ দমন। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও পুলিশের সেই ঔপনিবেশিক চরিত্র বদলায়নি; বরং প্রতিটি সরকার দলীয়করণের মাধ্যমে পুলিশকে ক্ষমতা রক্ষা ও বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি এই ইতিহাস বদলে দিতে পারেন। পুলিশকে দলীয় শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন, পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করলে তা আপনার ক্ষমতা দুর্বল করবে না—বরং আপনার সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াবে। দলীয় পুলিশ নয়, দেশের মানুষই হবে আপনার সবচেয়ে বড় ঢাল। তবে সতর্ক থাকতে হবে আপনার চারপাশের দুর্নীতিবাজ ও অর্থনৈতিক মাফিয়াদের নিয়ে—জনগণের পুলিশ গড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা আসবে তাদের কাছ থেকেই।
আসল প্রশ্নটা কী
আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরবে কি না—সেটা বড় প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন: শেখ হাসিনার মতো আরেকজন স্বৈরশাসক কি আবার তৈরি হতে পারবেন? জুলাইয়ের অভ্যুত্থান একটা সরকারকে ফেলে দিয়েছে, কিন্তু যে ব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদ জন্মায়, তা অক্ষত থাকলে দ্বিতীয় শেখ হাসিনা তৈরি হতে সময় লাগবে না—রোগজীবাণু যেমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সহজে ছড়ায়, দুর্বল ও দলীয়কৃত প্রতিষ্ঠান তেমনি স্বৈরাচারের জন্য উর্বর জমি। বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত থাকলে, পুলিশ প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহৃত হলে, প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের কথায় চললে—ব্যক্তি সরালেও একই শাসন ফিরে আসবে, শুধু মুখ বদলাবে।
তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পুলিশ, যাকে কোনো সরকার রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার বানাতে পারবে না, আর যার কর্মকর্তাদেরও পদোন্নতি-বদলির জন্য ক্ষমতাসীন দলের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে না।
সাম্প্রতিক একটি ফোনালাপের সতর্কবার্তা
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও পুলিশ বিভাগের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কণ্ঠটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ওসি মো. রাকিবুল হাসানের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়েছে; তাঁকে প্রত্যাহার করে ডিবিতে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি বক্তব্যকে প্রমাণিত সত্য বলা যাবে না, কিন্তু অডিওতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য ও পদায়নে অর্থ লেনদেনের যে অভিযোগ উঠেছে, তা সত্য হলে এটি একজনের ব্যক্তিগত অসন্তোষ নয়—বাহিনীর ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্বচ্ছ পদায়নব্যবস্থার লক্ষণ। শুধু একজন কর্মকর্তাকে শাস্তি দিয়ে বিষয়টি শেষ করা যাবে না; শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং অভিযোগের সত্যতা—দুটোই আলাদাভাবে তদন্ত করে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে।
হাসিনা আমল থেকে কতটা বদলেছে
শেখ হাসিনার আমলে পুলিশের একাংশকে বিরোধী দল দমন, গায়েবি মামলা, হেফাজতে নির্যাতনে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ আছে—জুলাই ২০২৪-এর প্রাণঘাতী শক্তিপ্রয়োগ তারই ভয়াবহ প্রকাশ। বর্তমান সরকার অনেক কর্মকর্তাকে বদলি বা অবসরে পাঠিয়েছে, কিন্তু কর্মকর্তা বদলানো আর প্রতিষ্ঠান সংস্কার এক নয়। আওয়ামী লীগ-অনুগতদের জায়গায় শুধু বিএনপি-অনুগতরা এলে, বা পুরোনো পদায়ন-বাণিজ্যের বদলে নতুন তদবিরচক্র তৈরি হলে, জনগণের জন্য মৌলিক কিছুই বদলাবে না। প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়—পুলিশ বদলেছে, নাকি শুধু তার আনুগত্যের কেন্দ্র?
এ সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল দলীয়করণ, দুর্নীতি ও পদায়ন-বাণিজ্য দূর করা। তাঁকে সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বাক্বিতণ্ডায় সময় ব্যয় করতে দেখলে আমরা হতাশ হই—তাঁর সাফল্য বিচার হবে সংসদে জবাব দেওয়া দিয়ে নয়, পুলিশকে কতটা প্রভাবমুক্ত করলেন তা দিয়ে।
ঔপনিবেশিক আইন, নতুন সমাধান
বাংলাদেশ পুলিশ এখনো মূলত চলে ১৮৬১ সালের Police Act দিয়ে—একটি আইন, যা তৈরি হয়েছিল শাসকের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে। স্বাধীন রাষ্ট্রে পুলিশের দর্শন হওয়া উচিত ঠিক তার উল্টো: পুলিশ শাসকের বাহিনী নয়, আইনের বাহিনী। জুলাই সনদের ৬৯ নম্বর প্রস্তাবে—৩০টি দল ও জোটের সম্মতিতে—একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশনের কথা বলা আছে। অন্তর্বর্তী সরকার ৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ এ নিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, কিন্তু কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, এবং সংসদ তা আইনে রূপ না দেওয়ায় ১১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারায়। আমাদের প্রশ্ন সহজ—আর কত অপেক্ষা?
আমাদের দাবি
আগামী মাসেই সংসদে একটি শক্তিশালী স্বাধীন পুলিশ কমিশন বিল আনুন—২০২৫-এর অধ্যাদেশের কার্যকর দিকগুলো রেখে, দুর্বলতাগুলো শুধরে, জুলাই সনদের অঙ্গীকারকে স্থায়ী আইনে রূপ দিয়ে। শুধু নামে “স্বাধীন” লিখলে চলবে না—চাই:
- রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, আইনের প্রতি আনুগত্য—মন্ত্রী-এমপি-বিরোধী নেতা যেই হোন, পুলিশের আচরণ বদলাবে না;
- অন্যায় আদেশ প্রত্যাখ্যানের অধিকার—বেআইনি নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করলে বদলি বা হয়রানির ভয় থাকবে না;
- নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতিতে রাজনীতি নয়, যোগ্যতা—কমিশনের সদস্য নিয়োগ স্বচ্ছ ও বহুপক্ষীয় হবে, আর মেয়াদ-বাজেট এমনভাবে সুরক্ষিত থাকবে যাতে সরকার অসন্তুষ্ট হলেই কমিশনকে অকেজো করতে না পারে।
স্বাধীনতা মানে জবাবদিহিহীনতা নয়
পুলিশকে প্রভাবমুক্ত করার মানে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া নয়। নির্যাতন, বেআইনি আটক বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে পুলিশের বাইরে সত্যিকার স্বাধীন ব্যবস্থা থাকতে হবে—কারণ নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের একমাত্র তদন্তকারী নিজেই হতে পারে না। কানাডার অন্টারিওর Special Investigations Unit, ইংল্যান্ড-ওয়েলসের Independent Office for Police Conduct, নিউজিল্যান্ডের Independent Police Conduct Authority, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের Police Ombudsman—সবার ক্ষমতার পরিধি ভিন্ন, কিন্তু নীতি এক: গুরুতর অভিযোগের বিচার অভিযুক্ত বাহিনীর নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর ছাড়া যায় না। বাংলাদেশকে কারও নকল করতে হবে না, কিন্তু নীতিটা ধার করতে দোষ নেই। আমাদের কমিশনের হাতে নথি তলব, সাক্ষী ডাকা ও স্বাধীন তদন্ত শুরুর কার্যকর ক্ষমতা থাকতে হবে—শুধু “সুপারিশ” করে দায়িত্ব শেষ করলে এটাও আরেকটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
আইন বদলালেই কাজ শেষ নয়—মানসিকতাও বদলাতে হবে। মানবাধিকার, বলপ্রয়োগের সীমা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়মিত প্রশিক্ষণের স্থায়ী অংশ হোক, আর ১৮৬১ সালের আইনের বদলে যুগোপযোগী একটি নতুন Police Act প্রণয়নের কাজ শুরু হোক।
মানবাধিকার কমিশনকেও শক্তিশালী করুন
২৭ আগস্ট সরকার সংসদে National Human Rights Commission Bill, 2026 তুলেছে; ২ সেপ্টেম্বর সংসদীয় কমিটি সংশোধনী প্রস্তাবসহ রিপোর্ট দিয়েছে, কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বর Transparency International Bangladesh বলেছে—সংশোধনের পরও স্বার্থসংঘাতমুক্ত তদন্তের মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে। বিল এখনো পাস হয়নি; সংশোধনের সুযোগ এখনো আছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে মানবাধিকার কমিশনের নিজস্ব স্বাধীন তদন্তক্ষমতা থাকতে হবে—যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকে দিয়েই তদন্ত করালে “স্বাধীন তদন্ত” শব্দটার কোনো অর্থ থাকে না।
এটা কাগজের কথা নয়। গুম-তদন্ত কমিশনের হিসাবে ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে; ১,২৮২ জন ফিরে এলেও অন্তত ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ ও মৃত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আরও ৩৬ জনের মরদেহ মিলেছে—আর কমিশন নিজেই বলছে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এটা শুধু অতীত নয়: ১০ এপ্রিল ২০২৬-এ জেলে মিরাজ শেখকে কোস্ট গার্ড তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তিনি এখনো ফেরেননি, ১২ জুলাই হাইকোর্ট তাঁকে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে, আর Human Rights Watch বলছে সত্য হলে এটি জুলাই ২০২৪-পরবর্তী প্রথম পরিচিত গুম হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা তৈরি না হলে পুরনো পদ্ধতি ফিরতে সময় লাগে না।
একজন ক্ষমতাবান বনাম একজন রাষ্ট্রনায়ক
জনাব প্রধানমন্ত্রী, আমরা জানি—এই প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করলে সেটা সবসময় আপনার জন্য আরামদায়ক মনে হবে না। সরকার তখন ইচ্ছেমতো পুলিশ ব্যবহার করতে পারবে না, কোনো গুরুতর অভিযোগ সহজে চাপা দিতে পারবে না। এটাই সত্য। কিন্তু ঠিক এখানেই একজন ক্ষমতাবান রাজনীতিক আর একজন রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
আজ আপনি যে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়বেন, তা আজকের জন্য আপনার ক্ষমতাকে কিছুটা সীমিত করবে বটে—কিন্তু কাল, যখন আপনি বা আপনার দল ক্ষমতায় নাও থাকতে পারেন, সেই একই প্রতিষ্ঠান আপনাদেরই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে রক্ষা করবে। আজ প্রতিপক্ষকে যে সুরক্ষা দেবেন, কালই তা হতে পারে আপনার নিজের রক্ষাকবচ। এটাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আসল সৌন্দর্য—এটা কোনো একজনের বা একদলের জন্য নয়, সবার জন্য সমান।
জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অর্জন তখনই স্থায়ী হবে, যখন আমরা শুধু একটা সরকারকে বিদায় দিয়েই সন্তুষ্ট থাকব না—কর্তৃত্ববাদ ফিরে আসার রাষ্ট্রীয় পথটাও চিরতরে বন্ধ করে দেব। এই কাজটা করে যেতে পারলে ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে না শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে—বরং বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ফেরার পথ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে যাওয়া একজন সংস্কারক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই—দলীয় পুলিশ নয়, দেশের মানুষই হবে আপনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঢাল।
সম্মানিত পাঠক, আপনি সহমত হলে এই খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করুন
স্বাক্ষরকারীদের তালিকা
- মহিউদ্দিন আহমেদ — Toronto, Canadaরাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক এবং সমাজ-চিন্তক। বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার ও সামাজিক সংস্কার বিষয়ে নিয়মিত লেখক।
- Razzak Syed — Melbourne, AustraliaExpatriate
- আবু ফারাহ মোহাম্মদ ফারুক — SCARBOROUGH, Canada
- Mohammad Waliuddin Waliuddin Tanvir — LEEDS, United KingdomLawyer
- রাশেদ চৌধুরী — Hajiganj, Chandpur ( Presently in the USA), BangladeshRetired. Former military officer and diplomat.